আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

যেসব ভুলে স্মার্টফোন হ্যাক হয়

সানোয়ার হোসেন

যেসব ভুলে স্মার্টফোন হ্যাক হয়

ডিজিটাল যুগে আমাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত এবং সংবেদনশীল সম্পদগুলোর একটি হলো স্মার্টফোন। ব্যাংকিং অ্যাপ, ব্যক্তিগত ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসের ই-মেইল, এমনকি ব্যক্তিগত কথোপকথন। সবকিছুই এখন এই ছোট ডিভাইসের ভেতর সংরক্ষিত। শুধু যোগাযোগ নয়, আর্থিক লেনদেন, সরকারি সেবা, অনলাইন কেনাকাটা, স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য, সবকিছুই এখন স্মার্টফোননির্ভর। ফলে একটি স্মার্টফোন হ্যাক হওয়া মানে শুধু একটি ডিভাইস হারানো নয়; বরং পুরো ডিজিটাল পরিচয় ঝুঁকিতে পড়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার পরও কেন স্মার্টফোন হ্যাক হচ্ছে? বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে বড় কোনো জটিল প্রযুক্তিগত আক্রমণ নয়। বরং ব্যবহারকারীর অজান্তে করা কিছু সাধারণ ভুলই দায়ী। সাইবার অপরাধীরা মানুষের অসতর্কতা, কৌতূহল এবং তাড়াহুড়ো করার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফল হয়। যেসব ভুলে বাড়ছে ঝুঁকিÑ

অচেনা লিংকে ক্লিক করা

বিজ্ঞাপন

হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ই-মেইল বা এসএমএসে ‘পার্সেল ডেলিভারি’, ‘অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘পুরস্কার জিতেছেন’ ধরনের বার্তা প্রায়ই আসে। এসব বার্তার সঙ্গে থাকা লিংক অনেক সময় ফিশিং ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। সেখানে লগইন তথ্য দিলে তা সরাসরি হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। অনেক সময় লিংকটি দেখতে আসল প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মতোই হয়, ফলে সন্দেহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অজানা উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড

অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোর ছাড়া অন্য উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করলে ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার ঢোকার ঝুঁকি থাকে। কিছু অ্যাপ বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ক্ষতিকর কোড থাকতে পারে, যা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে বা অন্য অ্যাপের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে।

দুর্বল ও একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার

‘123456’, জন্ম তারিখ বা সহজ শব্দ এখনো অনেকেই পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করেন। এসব পাসওয়ার্ড ভাঙা খুবই সহজ। একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করলে একটি হ্যাক হলেই অন্যগুলোও ঝুঁকিতে পড়ে যায়। এটি বড় ধরনের ডেটা ফাঁসের কারণ হতে পারে।

দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবহার না করা

অনেকেই এখনো Two-Factor Authentication চালু করেন না। অথচ এটি চালু থাকলে পাসওয়ার্ড ফাঁস হলেও অতিরিক্ত যাচাইকরণ ছাড়া অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যায় না। এই অতিরিক্ত স্তর নিরাপত্তাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পাবলিক ওয়াইফাইয়ে সংবেদনশীল কাজ করা

রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে বা শপিং মলের ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করে ব্যাংকিং বা গুরুত্বপূর্ণ লগইন করলে তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দুর্বল বা ভুয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হ্যাকাররা ডেটা ইন্টারসেপ্ট করতে পারে।

সফটওয়্যার আপডেট অবহেলা

অনেকে আপডেট নোটিফিকেশন দেখেও পরে করার জন্য রেখে দেন। অথচ আপডেটের মাধ্যমে নিরাপত্তা দুর্বলতা ঠিক করা হয়। পুরোনো ভার্সন ব্যবহার করলে পরিচিত নিরাপত্তা ফাঁক খোলা থাকে, যা হ্যাকাররা কাজে লাগাতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ

জন্ম তারিখ, ফোন নম্বর, ঠিকানা বা পারিবারিক তথ্য প্রকাশ্যে থাকলে তা দিয়ে সিকিউরিটি প্রশ্নের উত্তর অনুমান করা যায়। অনেক হ্যাকিংই সামাজিক প্রকৌশল কৌশলের মাধ্যমে ঘটে, যেখানে মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগানো হয়।

অ্যাপ পারমিশন যাচাই না করা

অনেক অ্যাপ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, লোকেশন বা কনট্যাক্টের অনুমতি চায়। ব্যবহারকারীরা না ভেবেই অনুমতি দিলে ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়ে।

কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন?

শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও জটিল পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করতে পারেন। দুই ধাপের নিরাপত্তা চালু রাখুন। Two-Factor Authentication চালু করলে অতিরিক্ত কোড বা যাচাইকরণ ছাড়া অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা সম্ভব হবে না। এটি নিরাপত্তার একটি শক্ত স্তর তৈরি করে। শুধু অফিশিয়াল স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করুন। অজানা লিংক বা ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা এড়িয়ে চলুন। ডাউনলোডের আগে অ্যাপের রিভিউ ও ডেভেলপার যাচাই করুন। নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করুন। অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ আপডেট রাখলে নিরাপত্তা দুর্বলতা দ্রুত ঠিক হয়। আপডেট দেরি করা মানে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ানো। পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। সংবেদনশীল কাজের সময় মোবাইল ডেটা ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত VPN ব্যবহার করতে পারেন। অ্যাপ পারমিশন পর্যালোচনা করুন। সেটিংস থেকে নিয়মিত দেখে নিন কোন অ্যাপ কী অনুমতি পাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় অনুমতি বন্ধ রাখুন। সন্দেহজনক বার্তা যাচাই করুন। কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে প্রেরকের পরিচয় নিশ্চিত করুন। অফিশিয়াল ওয়েবসাইট নিজে টাইপ করে প্রবেশ করা নিরাপদ। নিয়মিত ডেটা ব্যাকআপ রাখুন। ক্লাউড বা নিরাপদ স্টোরেজে ব্যাকআপ রাখলে হ্যাক বা ডেটা হারালে পুনরুদ্ধার করা সহজ হয়। স্মার্টফোন হ্যাক হওয়া শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সচেতনতার বিষয়। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সাইবার অপরাধও তত কৌশলী হচ্ছে। তাই স্মার্টফোন ব্যবহার যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি সুরক্ষিত রাখা দায়িত্বের অংশ। সচেতনতা, সতর্কতা এবং সঠিক অভ্যাসই পারে আপনার ডিজিটাল জীবনকে নিরাপদ রাখতে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...