‘আমার চুড়ির রিনিক-ঝিনিক রে
তার কাছে লাগত নাকি বেশ।’
সুন্দর হাতের চুড়ির রিনিক-ঝিনিক শব্দ সত্যিই রসিকজনের মনে ছন্দের উৎপত্তি ঘটায়। যুগ যুগ ধরে বাঙালি নারীর সাজে চুড়ি অন্যতম পছন্দের উপকরণ। সারা বছরই নারীরা সাজসজ্জায় চুড়ি পরতে পছন্দ করেন। আর উৎসব অনুষ্ঠানে তো হাতভরা চুড়ি না হলে তাদের চলেই না।
বাংলার নারীদের কাছে চুড়ির কদর সেই প্রাচীনকাল থেকেই, সাজগোজের সময় দুহাত ভরে চুড়ি না পরতে পারলে সাজটাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যেকোনো উৎসব আয়োজনের দিন জমকালো সাজের সঙ্গে একগুচ্ছ চুড়ির রিনিঝিনি রিনিঝিনি শব্দ যেন মনে ছন্দের কাঁপন তোলে। আর সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই বিদ্রোহী কবি লিখেছিলেন—
‘আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা,
তার কাঁকন চুড়ির কনকন।’
‘চুড়ি’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা রঙ-বেরঙের রেশমি চুড়ি। আপনার একেবারে হাতের নাগালে রাস্তার ফুটপাতে পথ চলতে গিয়েই সাশ্রয়ে কিনে নিতে পারেন পছন্দের রঙের রেশমি চুড়ি। নারীর হাতে রেশমি চুড়ির ইতিহাস প্রায় শত বছর আগের। তখন সম্ভ্রান্ত জমিদার ও নবাব পরিবারের নারীদের হাতে রেশমি চুড়ি থাকাটা ছিল অবধারিত। এখনো সেই রেশমি চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ আমাদের মনে দোলা দিয়ে যায়। তবে নতুন প্রজন্মের নারীদের কাছেও চুড়ি সমানভাবেই সমাদৃত।
চুড়ি যে নারীর সৌন্দর্য অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই তো চুড়ি বাঙালি নারীদের এক অনন্য অলংকার। চুড়ি পরতে ভালোবাসেন সব বয়সি নারী। উৎসবের দিন জমকালো সাজের সঙ্গে চুড়ি এখন অপরিহার্য হয়ে গেছে। তাই তো চুড়ি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের মজার মজার গান। এসব গানে নিত্য জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
‘কিনে দে রেশমি চুড়ি,
নইলে যাব বাপের বাড়ি….’
আবার নায়িকা কখনো গেয়ে ওঠেন—
‘হাতভরা চুড়ি চাই
রঙিলা শাড়ি চাই...’
রঙিন শাড়ির সঙ্গে নানা রঙের চুড়ির সমাহার না ঘটলে সাজ যেন কিছুতেই পরিপূর্ণ হয় না। কিশোরী, তরুণী, বধূসহ সব মেয়ের হাতেই নানা রঙের চুড়ির বর্ণিল সাজ উৎসবের আনন্দকে আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাঙালি উৎসবপ্রিয়। তাই প্রতিটি উৎসবে তারা রঙকে প্রাধান্য দিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতিকে সাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।
আর কিছুদিন পরেই বসন্তকালের আগমন ঘটবে। বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানে বাসন্তী বা হলুদ, আর বৈশাখে লাল-সাদা বিভিন্ন বর্ণের রেশমি চুড়ি পরে নারীরা নিজেকে নানাভাবে সাজায়। আবার দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় পতাকার রঙ মিলিয়ে লাল-সবুজ রঙের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে হাতভরা চুড়ি পরে। প্রতিটি উৎসবেই বাঙালি নারী চুড়ির সাজের জন্য বেছে নেয় শুধু বিশেষ বিশেষ রঙকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষ দিনগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে।
ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং বিশেষ দিবসকে গুরুত্ব দিয়ে চুড়ির রঙ নির্বাচন করেন বাঙালি নারীরা। বসন্তে লাল-হলুদ, বাসন্তী। বৈশাখে লাল-সাদা। বিশেষ দিবস, যেমন একুশে সাদা-কালো, আর বিজয় ও স্বাধীনতা দিবসে লাল-সবুজ রঙের চুড়ি হাতে পরে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটায় বাঙালি ললনারা। তবে তরুণীদের কাছে লাল-সবুজ চুড়ি সারা বছরই প্রিয়।
আর বাংলা বর্ষবরণে কিশোরী, তরুণী ও বধূরা নানা রঙের বিভিন্ন ডিজাইনের চুড়ির ডালি সাজিয়ে বসে, বর্ণিল সাজে নিজেকে সাজায়।
সাজসজ্জা সম্পর্কে জানতে চাইলে দাঁতের ডাক্তার সাদিয়া চৌধুরী তিথি বলেন, ‘যতই সাজগোজ করি, দুহাত ভরে চুড়ি না পরলে যেন সাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাছাড়া আমি চুড়ি পরতে খুব পছন্দ করি। সবসময় সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে মিলিয়ে হাতে চুড়ি পরে থাকি, আর শাড়ি পরলে তো দুহাতভরা চুড়ি ছাড়া কথাই নেই।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক শারমিনা শামস বলেন, ‘হাতভরা চুড়ি পরা বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ। আমি নিজেও চুড়ি পরতে খুব পছন্দ করি এবং বিভিন্ন উৎসবে-অনুষ্ঠানে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে দুহাত ভরে চুড়ি পরি।’
নবম শ্রেণির ছাত্রী মৌনতা বলে, ‘আমার চুড়ি পরতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু স্কুলে চুড়ি পরে যাওয়া নিষেধ। তাই যখন অনুষ্ঠান বা উৎসব হয় তখন হাত ভরে চুড়ি পরি।’
সারা বছরই পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে তরুণীদের হাতে নানা রঙের চুড়ি শোভা পায়। তাঁত বা সুতির শাড়ির সঙ্গে রেশমি চুড়ি পরতে পছন্দ করেন গৃহবধূ শামীমা হোসেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী দীপ্তি বললেন, ‘ড্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে সবসময় চুড়ি পরতে ভালো লাগে।’ কাচের নকশা করা চুড়ি এবং সুতা দিয়ে মোড়ানো বালা দীপ্তির বেশি পছন্দ।
বর্তমানে তরুণীরা শুধু শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজই নয়, ফতুয়া ও টি-র্শাটের সঙ্গেও চুড়ি পরে অবলীলায়। সব বয়সের নারীর হাতে এ চুড়ি বেশ মানিয়ে যায়। এছাড়া রয়েছে চোখজুড়ানো ‘ঝলক’ চুড়ি। সরু এ চুড়ি দেখতে সুন্দর, হাতে পরলে আরো ভালো দেখায়।
বর্তমানে সবকিছুতেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রচলিত ধারার বাইরে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে নান্দনিকতার দিকে। তাই অতীতের সাদামাটা এক রঙের কাচের চুড়িতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শিল্পের বাহারি ডিজাইনের ছোঁয়া। কাচের চুড়ির পাশাপাশি এখন কাচের চুড়ির ওপর নানা রঙের কাপড় ও সুতা, পাথর, চুমকি, জরিসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আনা হচ্ছে নতুনত্ব।
যুগ পাল্টেছে আর সেইসঙ্গে পাল্টেছে চুড়ির ধরনও। রেশমি চুড়ির পাশাপাশি সমানভাবে জায়গা করে নিয়েছে কাঠ, মেটাল, প্লাস্টিক আর মাটির চুড়িও; কারণ এগুলো প্রচলিত ধারার বাইরে এসে চুড়ির বৈচিত্র্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
যারা একটু বেশি ফ্যাশন-সচেতন, তারা বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস থেকে সংগ্রহ করতে পারেন কাঠের অথবা ধাতব চুড়ি। বিভিন্ন ডিজাইনের হাতে নকশা করা নানা রঙের চুড়ি একটু খোঁজাখুঁজি করলে সহজেই পেতে পারেন। এছাড়া রয়েছে সুতা, লেস ও কাপড়ে প্যাঁচানো চুড়ি। পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে সাজিয়ে তুলতে পারেন আপনার দুটি হাত।
চুড়ির দাম সম্পর্কে রাজধানী মার্কেটের এক চুড়ি বিক্রেতা ও ফুটপাতে চুড়ির ঝাকা বসা খালা বলেন, রেশমি চুড়ি ১০০ টাকা ডজন করে। বিভিন্ন ধরনের সূতার নকশা করা চূড়ির দাম জোড়া ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা।
হাতের গড়ন অনুযায়ী চুড়ি নির্বাচন করা উচিত। জন্মদিন বা বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে মাঝখানে দুটি করে সোনালি বা রুপালি চুড়ি পরে হাতের সৌন্দর্য আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারেন। গোলাকার হাতের অধিকারীরা পছন্দমতো যেকোনো চুড়ি পরলেই তাদের হাতে মানিয়ে যায়। কিন্তু যাদের হাতের গড়ন পাতলা, তাদের হাতে মোটা বালা ভালো মানায়, আর যাদের হাতের গড়ন চ্যাপ্টা তারা চিকন কাচের বা ধাতব পদার্থের চুড়ি বেছে নিতে পারেন।
হাতের গড়নের সঙ্গে মিলিয়ে দুহাতভরা চুড়ি হাতের সৌন্দর্য যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি সাজকে করে পরিপূর্ণ। সবশেষে ‘চুড়ি’ নিয়ে কবিতাটি দিয়ে শেষ করছি—
‘মন ভোলানো কারুকাজে
দেখ না কেমন মাতাল করা
রিনিক-ঝিনিক নাড়াচাড়া
পেলব আলোয় হাত পেতে ধর ছুঁড়ি!
... ... ... ... ... ... ...
হাত মেলে ধর পরিয়ে দিই
দুঃখ-সুখের চুড়ি।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

