প্রতি বছরের মতো এ বছরও আন্তর্জাতিক নারী দিবসের রয়েছে নিজস্ব প্রতিপাদ্য। ২০২৬ সালের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—‘আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।’
নারী দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।
১৮৫৭ সালে অবিভক্ত ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে যখন সিপাহি-জনতার বিদ্রোহ চলছে, সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে প্রতিবাদ মিছিল করছেন নারী শ্রমিকরা। সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা ১৮৫৭ সালে মজুরিবৈষম্য, আট ঘণ্টার মধ্যে শ্রমসময় নির্দিষ্ট করা এবং কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন। তাদের এই প্রতিবাদ মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকারের পুলিশ বাহিনী। চলে দমন ও নিপীড়ন।
শ্রমিকদের জন্য কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করার দাবি শেষ পর্যন্ত আদায় হয়। তবে নারী ও পুরুষের মজুরিবৈষম্য চলতেই থাকে।
সেময় থেকেই মানবমুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় নারীমুক্তির আন্দোলন। ১৯০৯ সালে নিউ ইয়র্কে সোশ্যাল ডেমোক্রেট নারী সংগঠনের আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নারী নেতা ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতিবছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন।
তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হতে থাকে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ করা এবং নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়।
নারীর মুক্তির পথে মিশে আছে বহু মানুষের আত্মদান। নারীর ভোটাধিকারের জন্য ইউরোপে স্যাফ্রোজেটদের আন্দোলন, রুশ বিপ্লব, চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব—সবকিছুই নারীর মুক্তির ধারাকে বেগবান করেছে।
ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোন বোভেয়ার, বেটি ফ্রিডানসহ মানবাধিকার লেখকরা নারীর পরাধীনতার স্বরূপ উদ্ঘাটন করে মানবসমাজের চিন্তাজগতে নিয়ে এসেছেন বিপ্লব।
ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর ওপর নির্যাতন কম হয়নি। কখনো ধর্মের নামে, কখনো সামাজিক প্রথার নামে তার কণ্ঠকে রুদ্ধ করা হয়েছে বারবার। গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ নারী যে ভূখণ্ডে ছিলেন, সেখানেই পরবর্তীকালে নারীর বিদ্যাশিক্ষা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এদেশে গৌরীদান ও রোহিনীদানের নামে বাল্যবিয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়েছে নারীকে। সতীদাহের নামে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বিধবার ওপর সহস্র নিয়মকানুনের বোঝা চাপিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তিলে তিলে।
পর্দাপ্রথার নামে নারীর ওপর কী ভয়াবহ নিষ্পেষণ চলেছে, তা বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনী বইয়ের পাতায় পাতায় বিধৃত হয়েছে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সরলা ঘোষাল, নবাব ফয়জুননেসা ও বেগম রোকেয়ার মতো মহামানবদের প্রচেষ্টায় এদেশের নারীর জন্য ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়েছে জীবনের পথ। পরবর্তীকালে বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামালের মতো নারীরা এগিয়ে এসেছেন নির্যাতনের ঘেরাটোপ থেকে নারীকে বাঁচাতে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু হওয়ার পর ১০০ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনো কি সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে?
কোথায় নারী নিরাপদ? বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কায়দায় তার ওপর চলছে নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্য। জন্ম নেওয়ার আগে ভ্রূণ অবস্থায় তাকে হত্যা করা হচ্ছে। জন্মের পর অবহেলা করা হচ্ছে। অপুষ্টির শিকার হতে হচ্ছে তাকে, হতে হচ্ছে নানারকম বৈষম্যের শিকার। অনেক দেশে কিশোর বয়সে তার অঙ্গহানি করা হচ্ছে, অপ্রাপ্ত বয়সে তাকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে ও পথেঘাটে তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে। পারিবারিক সম্মানরক্ষার নামে তাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুর মুখে। অনেক দেশে তাকে ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি। তাকে অর্থনৈতিক অধিকার দেওয়া হয়নি। কোথাও তাকে ঘরে বন্ধ করে রাখা হয়েছে, কোথাওবা তাকে যৌনসামগ্রী হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। নারীর ওপর এভাবে যদি নির্যাতন ও সহিংসতা চলতে থাকে এবং নারীর অধিকার লঙ্ঘন হতে থাকে, তাহলে একসময় নারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকবে। একপর্যায়ে মানব প্রজাতির বংশধারাই পড়বে হুমকির মুখে।
নারী ও কন্যার অধিকার অর্জনের জন্য সমাজের সব ক্ষেত্রে দরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এমন এক দেশ এমন এক বিশ্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য নেই—যে সমাজ সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, যে দেশে নারী ও কন্যার অধিকার সুরক্ষিত। আজকের দিনে এ বিষয়ে উদ্যোগী হলে ভবিষ্যতে এমন সমাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে।
এটিই নারী দিবসের অঙ্গীকার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

