বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির এক ঐতিহ্যবাহী লোকউৎসব। হাজার বছর ধরে আমাদের অতীত ইতিহাস ও অসাম্প্রদায়িকতার নিদর্শন হিসেবে প্রতিবছর বৈশাখ মাসের ১ তারিখ পালিত হয় সর্বজনীন এ উৎসব। বাঙালির ঐতিহ্য হৃদয়ে লালন এবং এর মাধ্যমে অতীতের গ্লানি ও ভেদাভেদ ভুলে সবাই বাংলা নতুন বছর বরণ করে নেয় । নানারকম বর্ণিল আয়োজনে মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ পালিত হলো। এ নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ভাবনা তুলে ধরেছেন
নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্যের ধারক
পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির চিরায়ত ঐতিহ্য। প্রতিবছর বাংলা সনের প্রথম দিন অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল আসে নতুন আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে। হাজার বছর ধরে বহমান এই ঐতিহ্যকে বাঙালিরা বিভিন্ন উৎসব ও আনন্দের মাধ্যমে বরণ করে নেয়, পুরোনো সব গ্লানি মুছে নতুন বছরকে নতুন উদ্যমে শুরু করে। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ঘরে ঘরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন করা হয়। এছাড়া এদিন বাঙালি নারী-পুরুষদের সাজে ফুটে ওঠে পুরোপুরি বাঙালিয়ানা সাজ। পুরুষরা লুঙ্গি, পাঞ্জাবি অথবা গেঞ্জি এবং নারীরা লাল-সাদা শাড়ি পরে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। এ যেন এক অনন্য ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। নববর্ষকে বরণ করে নিতে গাওয়া হয় বিভিন্ন বৈশাখী গান। এসব আয়োজন দিনটিকে করে তোলে আরো বর্ণিল ও প্রাণবন্ত। বাংলা নববর্ষকে রাঙিয়ে দিতে গ্রামেগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় আকর্ষণীয় উৎসব বৈশাখী মেলা। গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের মিলনমেলা তৈরি হয়, যেটি বাঙালির শিকড়কে আরো গভীরভাবে দৃঢ় করে। সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ যেন বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিফলন।
উম্মে জোবায়দা
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ নববর্ষ
‘বাংলা নববর্ষ’ বাঙালির প্রাণ, বাঙালির ঐতিহ্য। এটি শুধু একটি দিন হিসেবে পরিচিত নয়, বরং এটি বাঙালির অস্তিত্বের প্রতীক, তাদের শেকড় এবং তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দিনটিকে বাঙালিরা পালন করে নানা ধরনের উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে এই দিনটির সূচনাই হয় ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো’ এই গানটির মাধ্যমে। পহেলা বৈশাখের এই দিনটিতে আয়োজন করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীরা নাচ, গান ও কবিতায় বৈশাখ উদ্যাপনের আনন্দে মেতে ওঠে। বাংলার নববর্ষ উদ্যাপন এখানেই শেষ নয়। শহরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রাম-বাংলায় এই উৎসবকে ঘিরে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন গ্রামীণ মেলার, যেখানে বাঙালি মেয়েরা মাটির পাত্র, মৃৎশিল্প, কাঠের কাজ, বাঁশের তৈরি জিনিস, রঙিন লাঠি ও হস্তনির্মিত রঙিন খেলনার পসরা সাজিয়ে বসেন, যা বাঙালি জাতির ঐতিহ্যকে আরো প্রবল করে তোলে। এর মাধ্যমে পুরোনো বছরকে বিদায় দিয়ে আগমন ঘটে একটি নতুন দিনের, নতুন জীবনের ও নতুন বর্ষের।
জান্নাতুল মাওয়া রিফাত
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, ইডেন মহিলা কলেজ
সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য মেলবন্ধন
বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির জীবনে এক অনন্য নিদর্শন। প্রতি বছর এই দিনটিতে গ্রাম থেকে শহর প্রতিটি জায়গা নববর্ষের নতুন সাজে সেজে ওঠে। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বিভিন্ন জায়গায় বৈশাখী মেলা, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যের আসরের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ, যা বাঙালিদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এই উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সর্বজনীনতা। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে, যেখানে থাকে না কোনো ভেদাভেদ, কোনো হিংসাবিদ্বেষ, কোনো অসাম্প্রদায়িকতা। সবাই মিলে একসঙ্গে মেতে ওঠে নববর্ষের নতুন ছোঁয়ায় এবং গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি। সবার সেদিন একটাই পরিচয়—আমরা বাঙালি। বাংলা নববর্ষ বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিভেদরেখা নিমিষেই মুছে দেয় এবং তৈরি করে এক অসাধারণ সম্প্রীতির বন্ধন—সবাইকে একতাবদ্ধ করে গড়ে তুলে এক অটুট ও দৃঢ় সম্পর্ক। তাই বাংলা নববর্ষ কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালির ঐক্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক।
শেখ সুলতানা মীম
ইংরেজি, ইডেন মহিলা কলেজ
পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুন সূচনার প্রত্যাশা
পহেলা বৈশাখ মানেই সেই মহামিলনের লগ্ন, যেখানে জরা আর গ্লানি ধুয়েমুছে আমরা শুদ্ধ হই। কালবৈশাখীর রুদ্র রূপ যেমন ধূলিকণা উড়িয়ে নিয়ে প্রকৃতিকে স্নিগ্ধ করে, ঠিক তেমনি আমাদের জীবনের সব জড়তা আর ব্যর্থতা এই উৎসবে বিলীন হয়ে যায়। বৈশাখ আমাদের শিখিয়ে দেয়, যেকোনো শেষই চূড়ান্ত নয়, বরং তা এক নতুন সম্ভাবনার জন্মদ্বার। আমরা স্বপ্ন দেখি এমন এক ভোরের, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হবে। পেছনে ফেলে আসা বছরের সব অপ্রাপ্তি আর দীর্ঘশ্বাস আজ একপাশে সরিয়ে রেখে আমরা বুক বাঁধি এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়। বাঙালির এই চিরন্তন উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শেকড়ের টানেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। হিংসা আর সংকীর্ণতা ভুলে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই ছিল এবারের নববর্ষের মূল প্রতিজ্ঞা। নতুন বছরের মতোই যেন স্নিগ্ধ ও সুন্দর হোক দেশ এবং শুভ নববর্ষের শুদ্ধতা ছড়িয়ে পরুক বাঙালির হৃদয়ে।
শাম্মী শফিক জুঁই
ইংরেজি, ইডেন মহিলা কলেজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

