রাত সাড়ে ৯টা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর। অফিসফেরত মানুষের ভিড়, যানজট আর অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু অটোরিকশার চালকদের চাহিদা যেন একটু বেশিই। ৩০ টাকার ভাড়ার জন্য তারা ৬০-৭০ টাকা দাবি করছিল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটি অটোরিকশা এসে আমার সামনে থামল। চালকের আসনে ছিলেন একজন নারী। মুখে মৃদু হাসি। তিনি বললেন, ‘চলেন আপা, ন্যায্য ভাড়াই নেব।’
কিছুটা কৌতূহল নিয়ে তার অটোরিকশায় উঠলাম। স্বীকার করতেই হবে, কৌতূহলের পাশাপাশি কিছুটা সংকোচ ও ভয়ও ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব সংকোচ ও ভয় দূর হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, তিনি একজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী চালক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক হয়ে বসলাম। পথ চলতে চলতে স্বভাবসুলভভাবে গল্প জুড়ে দিলাম। সেই গল্পের বিষয়বস্তু ছিল চালকের আসনে বসা নারী—বিউটি আপার জীবন ও সংগ্রাম।
বিউটি আপার সংসারে সদস্যসংখ্যা ছয়জন—স্বামী, দুই সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তিনি নিজে। এত দিন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার স্বামী। সীমিত আয়ে কোনো রকমে চলছিল সংসার। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। কবে আবার সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারবেন, কিংবা আদৌ ফিরতে পারবেন কি নাÑতার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার কঠিন সংকটে পড়ে। বিপদের সময়ে কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকেও সহযোগিতা মেলেনি। সংসারের আয়-রোজগারে কিছুটা সহায়তা করতে তার বয়স্ক শ্বশুর একটি স্কুলের সামনে বস্তা পেতে শাকসবজি বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু তাতে আর কতটুকুই বা আয় হয়?
এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মতো ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি বিউটি। সংসারের হাল ধরতে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে গার্মেন্টসে কাজ করেছেন, বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজও করেছেন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তাকে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি পেশা, যেখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে তিনি নিজের সময়, শ্রম ও মর্যাদাকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
বিউটি আপা এখন একজন অটোরিকশাচালক। আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবনযুদ্ধে সফলভাবে এগিয়ে চলা একজন স্বনির্ভর নারী। বিউটি আপা হিজাব পরেন। তার নিজস্ব কিছু নীতি রয়েছে। তার পাশের আসনে কোনো পুরুষ যাত্রী বসতে দেন না। অর্থাৎ সম্মান ও নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি নিজের কাজ করেন।
প্রতিদিন রাস্তায় নেমে যাত্রী পরিবহন করে তিনি আয় করেন, সংসারের খরচ চালান, স্বামীর চিকিৎসার ব্যয় বহন করেন এবং সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব পালন করেন। তার কাছে এই কাজ শুধু একটি পেশা নয়; বরং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন পরিচিত ব্যক্তির একটি পোস্টে দেখলাম, তিনি লিখেছেন—‘তার এলাকায় একজন নারী অটোরিকশা চালান, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’ বিষয়টি আমার ভালো লেগেছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিউটি আপার মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠল। মন্তব্যে আমি লিখেছিলাম, ‘আমাদের এলাকায়ও একজন নারী অটোরিকশা চালান। ভালো লাগছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসছে। বিষয়টি ইতিবাচক ও সুন্দর।’
আশ্চর্যের বিষয়, এই মন্তব্য নিয়ে আপত্তি তুলে একজন অচেনা ব্যক্তি ফিরতি মন্তব্যে প্রশ্ন তোলেন—‘তাহলে আপনি চালান না কেন?’
শুধু তাই নয়, তিনি আমার মন্তব্যের স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টও করেন। তিনি লেখেনÑ‘একজন অসহায় নারীর কষ্ট দেখে আরেক নারী আনন্দ পাচ্ছে। এটি অসংবেদনশীলতা।’
আসলে জীবনের অসহায়ত্বে সমবেদনা থাকেই, তবু এখানে ভালো লাগার বিষয় হলো, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মুখ থুবড়ে পড়ে থেকে মানবেতর জীবনযাপন না করে, পরনির্ভরশীল না হয়ে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার নিমিত্তে লড়াই করার সাহস।
একজন নারী যে পরিস্থিতির কাছে হার না মেনে, সততা ও সম্মান নিয়ে নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন সেই দৃঢ়তাকে স্বীকৃতি দেওয়াই তো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যা অবশ্যই সুন্দর।
সমাজের একটি অংশ এখনো মনে করে, নারী ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে অথবা সমাজের প্রচলিত নির্দিষ্ট কিছু পেশার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সংকট কিংবা জীবনের কঠিন মুহূর্তে একজন নারীর জন্য আর্থিক স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।
নিজের উপার্জন একজন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আর্থিকভাবে স্বাধীন নারী নিজের মতামত প্রকাশে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অধিক সক্ষম হন। এতে তার আত্মসম্মানবোধও বৃদ্ধি পায়।
জীবন সবসময় একই ধরনের থাকে না। পরিবারে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, চাকরি হারানো বা অন্য কোনো সংকট দেখা দিলে একজন নারীর আয় পুরো পরিবারের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নারী নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের প্রতিও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
একজন শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী মা সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নৈতিক বিকাশে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। গবেষণায় দেখা যায়, নারীর আয় পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল নারীরা অনেক সময় অবহেলা, বৈষম্য কিংবা নির্যাতনের শিকার হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পান না। কিন্তু স্বাবলম্বিতা নারীর মধ্যে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি তৈরি করে।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষেত্র ও উৎপাদন ব্যবস্থার বাইরে রেখে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী যত বেশি কর্মমুখী ও স্বাবলম্বী হবেন, দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হবে।
একজন নারী শিক্ষক, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা কিংবা ব্যাংকার হতে পারে, তেমনি তিনি চালক, মেকানিক বা কৃষকও হতে পারেন। পেশার কোনো লিঙ্গ নেই; আছে শুধু শিক্ষা ও যোগ্যতার পার্থক্য। আর যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করার অদম্য ইচ্ছে, পরিশ্রম ও সততা।
বিউটি আপার গল্প কোনো রূপকথা নয়। এটি আমাদের সময়ের গল্প। এমন অসংখ্য নারী আছেন, যারা প্রতিদিন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের পরিবারকে আগলে রাখছেন। হয়তো তাদের গল্প সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয় না। কিন্তু তারাই আমাদের সমাজের নীরব নায়ক।
তাই একজন নারী অটোরিকশা চালাচ্ছেনÑএটি শুধু একটি পেশার গল্প নয়। এটি দায়িত্ববোধ, আত্মসম্মান, সংগ্রাম এবং স্বনির্ভরতার গল্প। যে গল্প নিঃসন্দেহে ভালো লাগার, ইতিবাচক এবং সুন্দর। এ ধরনের ইতিবাচকতার গল্পগুলো সামনে আসুক।
সবশেষে বলব, নারীর স্বাবলম্বিতা কোনোভাবেই পুরুষ বিরোধিতা নয়; ব্যঙ্গ বা বিদ্রুপের বিষয় নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের কল্যাণের জন্য অপরিহার্য একটি বিষয়। একজন স্বাবলম্বী নারী শুধু নিজের জীবনই আলোকিত করেন না, তিনি একটি পরিবারকে শক্তিশালী করেন, একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই নারীর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

