নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা শুধু আমাদের সমাজের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারের ঝকঝকে মোড়কে মোড়ানো খাবারের ভেতরে যখন থাকে সংরক্ষণকারী রাসায়নিক দ্রব্য, কৃত্রিম রঙ আর অদৃশ্য শঙ্কা, তখন অনেকেই ফিরে তাকাচ্ছেন ঘরোয়া রান্নার দিকে। সেই আস্থার জায়গা থেকেই আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন বুনেছেন ‘Somraggi’s Kitchen’-এর প্রতিষ্ঠাতা সেলিমা সুলতানা নীলু। নিজের হাতে তৈরি সস, আচার, ফলের জুসসহ নানা ধরনের সুস্বাদু ও নিরাপদ ঘরোয়া খাবার তৈরি করে তিনি আত্মনির্ভর আর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বুনেছেন— যা কেবল ব্যবসা নয়, বরং বিশ্বাসেরও গল্প। ভেজালমুক্ত খাবার সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তার ভেতরে আছে একজন নারীর আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার দৃঢ়তা।
আত্মপরিচয়ের প্রেরণা নিয়ে শুরু
প্রত্যেক সফল মানুষের পেছনে অনুপ্রেরণা থাকে। সেলিমার ক্ষেত্রে সেই অনুপ্রেরণা তিনি নিজেই। পরিবার ও সংসার সামলে একসময় তার মনে হয়েছে—শুধু স্ত্রী বা মা পরিচয়েই থেমে থাকলে চলবে না, নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে রান্নার প্রতি তার আলাদা টান ছিল। মায়ের অজান্তে রান্না করে প্রতিবেশীদের খাওয়ানো এবং স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে রান্না তার নেশায় পরিণত হয়। সেই নেশাই ২০২২ সালে পেশায় রূপ নেয়। Somraggi’s Kitchen প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেন।
শত বাধার মধ্যে লক্ষ্যে অটুট থাকা
সেলিমার কিচেন কিংবা উদ্যোক্তা হওয়া শুরুটা অতটা সহজ ছিল না। কারো সাহায্য তো দূরের কথা, পরিবার-প্রতিবেশী সবার কাছে নেতিবাচক কথা শুনেই তিনি ছোট থেকে বড় হয়েছেন। তিনি তারপরও লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিখেছেন সমালোচনা ও নেতিবাচক কথা তাকে থামাতে পারবে না। অনেক সময় এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাকে—‘তুই তো রান্না করে মেট্রিক পাসটাও ঠিকমতো করতে পারবি না।’ তবে সেলিমা থেমে যাননি। তিনি সব সমালোচককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসএসসি, এইচএসসি ও এমএ পাস করেন। তাকে ঘর-সংসার সামলাতে হয়, তিনি চাকরিও করেছেন একসময়; তবে সবকিছুর মাঝেও তিনি নিজের আত্মপরিচয় ও স্বপ্নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রান্না তার শখ নয়, এটি হয়ে গেছে তার জীবনের অঙ্গ। প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও দৃঢ় মনোবল। তারই ধারাবাহিকতায় ফ্রোজেন ফুড, আচার, সসসহ স্বাস্থ্যসম্মত ঘরের তৈরি পণ্য নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন সেলিমা। প্রতিটি আইটেম নিজ হাতে তৈরি, যত্ন ও নিখুঁত নিয়মে তৈরি, যাতে গ্রাহক একসঙ্গে পায় স্বাদ ও সুস্বাস্থ্য। শুধু অনলাইন পেজের মাধ্যমে নয়, অফলাইনেও শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য তিনি টিফিন আইটেম তৈরি করে দিয়েছেন, যা তার উদ্যোগকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিতি দিয়েছে।
স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা
সেলিমা শুধু পরিকল্পনায় থেমে থাকেন না। যেকোনো উৎসব, মেলা কিংবা আয়োজন মানেই নিজের স্টল নিয়ে হাজির হন। মানুষের সরাসরি প্রতিক্রিয়া তাকে সাহস জোগায়। সেরা রাঁধুনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভিন্নধর্মী খাবার তৈরি করে বিচারকদের মন জয় করেছেন বহুবার। তার খাবারের স্বাদ একবার যিনি নেন, বেশিরভাগই আবার ফিরে আসেন; কারণ তিনি স্বাদের সঙ্গে আপস করেন না, স্বাস্থ্যকর উপাদানেই ভরসা রাখেন। শুরুতে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি জেলি ছিল তার সিগনেচার আইটেম। পরে আচার ও নানা ফ্রোজেন খাবার যুক্ত হয় তালিকায়।

সনাতনী স্বাদে আধুনিক সচেতনতা
খাবার তৈরিতে সেলিমা সনাতনী ও ডিজিটাল উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। তবে হোমমেড ফুড হওয়ায় তার কাছে সনাতনী পদ্ধতির গুরুত্ব বেশি; বিশেষ করে আচার তৈরির সময় তিনি সেগুলো ছাদে রোদে শুকিয়ে নেন। এ বিষয়ে সেলিমা জানান, ঢাকা শহরে রোদ পাওয়াটা কষ্টকর। তবে আচার রোদে শুকালে একইসঙ্গে ‘ভিটামিন ডি’ও পাওয়া যায়, যা আরো পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর হয়। সালিমার তৈরি সিগনেচার পণ্য আচার, সস ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন, অফলাইনসহ স্থানীয় বাজারে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
নতুন নারী উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে সেলিমা বলেন, ‘আমি চাই না কোনো নারী বেকার থাকুক। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজের দক্ষতা কাজে লাগাতে হবে। নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এতে কেবল নিজের পরিচয়ই তৈরি হয় না, স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।’
হোমমেড থেকে হোমব্র্যান্ড
আজ Somraggi’s Kitchen শুধু হোমমেড ফুডের একটি ব্যবসা নয়, এটি এক নারীর আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও স্বপ্নেরও প্রতীক। ঘরে তৈরি খাবারের স্বাদকে তিনি গ্রাহকের আস্থা ও বাজারের ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করেছেন। সেলিমার এই পথচলা দেখিয়েছে, যেকোনো স্বপ্ন কঠিন হলেও ধৈর্য, নিষ্ঠা আর স্থির মনোবল থাকলেই তা বাস্তবে রূপ নেয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

