আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গাজার নারীরা : যুদ্ধ, সত্য এবং মানবতার সাক্ষ্য

ফাতিমা তামান্না

গাজার নারীরা : যুদ্ধ, সত্য এবং মানবতার সাক্ষ্য

সারা বিশ্বে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্‌যাপন করা হয়। এ উপলক্ষে কত আয়োজন; ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়, বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ আর নানা প্রতীকী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো নারী দিবস। আর সেই সময় গাজার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এ যেন নতুন এক পৃথিবী। এখানে বাস্তবতা হলো বোমার শব্দ, ধ্বংসস্তূপ, অনিশ্চয়তা আর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

গাজায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হাজার হাজার নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছেন, অসংখ্য পরিবার ভেঙে গেছে এবং লক্ষাধিক নারী তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। কিন্তু এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও গাজার নারীরা নিশ্চুপ থাকেননি। অনেকেই নিজের অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। কেউ চিকিৎসক হিসেবে, কেউ শিক্ষক হিসেবে, কেউ মানবিক সহায়তা কর্মী হিসেবে, আর কেউ সাংবাদিকতার গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অসাধারণ সাহসিকতার। যুদ্ধক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু গাজার নারীরা এই কাজ করেছেন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। তাদের হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র; ছিল শুধু ক্যামেরা, নোটবুক আর মোবাইল ফোন। কিন্তু সেই সাধারণ জিনিসগুলোই হয়ে উঠেছিল সত্য উন্মোচনের শক্তিশালী মাধ্যম।

বিজ্ঞাপন

তারা শুধু খবরই জানাননি; তারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন মানুষের বেঁচে থাকার চিত্র। তারা দেখিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবনের করুণ আর্তনাদ এবং প্রতিদিনের মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস। তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমেই পৃথিবী জানতে পেরেছে গাজার বাস্তবতা।

তবে এই সাহসের মূল্যও তাদের কম দিতে হয়নি। দেখা গেছে, গাজায় নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই নারী। তারা শুধু সংবাদকর্মী ছিলেন না; তারা ছিলেন মা, বোন, কন্যা, বন্ধু; সর্বোপরি সমাজের জীবন্ত কণ্ঠস্বর।

এই নারীদের একজন ছিলেন সাংবাদিক মারিয়াম আবু দাক্কা। বহু বছর ধরে তিনি গাজার মানুষের জীবন, অবরোধ আর যুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় তিনি নিহত হন।

মারিয়াম শুধু একজন দৃঢ়চেতা সাংবাদিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মা। যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি নিজের ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে ছেলেকে লেখা তার কথাগুলো আজও অনেকের হৃদয়ে গেঁথে আছে, ‘গাইথ, আমার হৃদয় আর আত্মা, আমার জন্য দোয়া করবে। আমার মৃত্যুতে কেঁদো না।’

আরেকজন তরুণ কণ্ঠ ছিলেন ফটোসাংবাদিক ফাতিমা হাসসুনা। তিনি জানতেন যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করার ঝুঁকি কতটা ভয়ংকর। তবুও তিনি ক্যামেরা হাতে গাজার মানুষের কথা তুলে ধরতে পিছপা হননি। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘যদি আমি মারা যাই, আমি চাই আমার মৃত্যু যেন গর্জে ওঠে—আমি যেন শুধু একটি সংখ্যা হয়ে না থাকি।’

অল্প সময়ের মধ্যেই সেই কথাগুলো যেন এক ভয়ংকর বাস্তবতায় পরিণত হয়। বোমা হামলায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি পরিবারের ছয়জন সদস্যসহ নিহত হন। মৃত্যুর ঠিক আগের দিনই ঘোষণা করা হয়েছিল যে, তাকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে। তার মৃত্যুর পর সেই চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছিল। সে সময় দর্শকরা দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানান এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান তোলেন।

গাজার নারী সাংবাদিকদের দৈনন্দিন বাস্তবতা ছিল অবিশ্বাস্য কঠিন। অনেক সময় তারা বোমা হামলার মাঝখান থেকেই খবর পাঠিয়েছেন। একদিকে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে সংবাদ সংগ্রহ—দুই দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করতে হয়েছে তাদের।

কখনো ক্ষুধার চিত্র তুলে ধরেছেন, অথচ নিজেরাও দিনের পর দিন ঠিকমতো খাবার পাননি। কখনোবা শোকাহত পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, আর কিছুদিন পর নিজেরাই প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছেন। তাদের কাজের পরিবেশও ছিল ভয়াবহ। বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট প্রায় অচল, নিরাপদ আশ্রয় নেই। তবুও তারা লেখা থামাননি, ছবি তোলা বন্ধ করেননি।

গাজার অনেক তরুণ সাংবাদিকের কাছে এই নারীরাই আজ অনুপ্রেরণা। তাদের জীবন দেখিয়েছে, সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের কাজ নয়। এটি এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব—মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণ করা, ইতিহাস নথিবদ্ধ করা এবং ধ্বংসের মধ্যেও মানবতার প্রমাণ রেখে যাওয়া।

তারা বিশ্বাস করতেন, যতদিন কেউ সত্য বলে যাবে, ততদিন পৃথিবী সম্পূর্ণভাবে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...