শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়তে যাব। আমার বাসস্থানের কাছাকাছি একটি মুসলিম মহল্লা রয়েছে। সেখানে দেশি-বিদেশি অনেকেই জুমা পড়েন। ঘটনাটি চীনের ইউননান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং শহরের। আমি ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিভাগের শিক্ষক। শহরের একপ্রান্তে ছ্যংকুং জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছেই থাকি। এর কাছাকাছি লিয়ান্ডা স্ট্রিটে রয়েছে হুই মুসলিম কমিউনিটির একটি মহল্লা। সেই মসজিদে যাওয়াই সুবিধাজনক। হুইহুইইন মহল্লার এই মসজিদে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা চমৎকার। এখানে স্থানীয় মুসলিমরা যেমন আসেন, তেমনি কাছাকাছি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরাও আসেন। বহুতল মসজিদটির দোতলায় নারীদের নামাজ পড়ার জন্য বিশাল কক্ষ রয়েছে।
কুনমিং শহরে অনেকগুলো মসজিদ রয়েছে। সব মসজিদেই নারীদের জন্য নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। চীনের প্রায় প্রতিটি শহরেই মুসলিম জনগোষ্ঠী আছে। সব শহরেই রয়েছে মসজিদ। আর সব মসজিদেই পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে। কোথাও পৃথক কক্ষ, আবার কোথাও একই হলঘরে নারী ও পুরুষ মুসল্লিদের মাঝখানে পর্দা দিয়ে পৃথক করা।
বিশাল দেশ চীন। এখানে রয়েছে ৫৬টি জাতিগোষ্ঠী। এদের মধ্যে দশটি জাতির মানুষ ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিও রয়েছে। উইগুর, তাজিক, কাজাখ, তাতার, হুই—এমন অনেক জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যারা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে এবং ধর্ম হিসেবে ইসলামকে মেনে চলে।
চীনের অনেক মুসলিম নারীর সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে। কুনমিংয়ে আমার অনেক মুসলিম নারী বন্ধু আছেন, যারা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন পেশায় সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। সিনচিয়াং অঞ্চলের উইগুর, তাজিক, কাজাখ জাতিগোষ্ঠীর নারীদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। তাদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেছি।
চীনের মুসলিম নারীরা বেশ সাফল্য ও সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন জীবনের পথে। উইগুর নারীদের জীবন একসময় ছিল বেশ ট্র্যাডিশনাল। তখন ১৬-১৭ বছর বয়সেই তাদের বিয়ে হয়ে যেত। তারা শুধু পারিবারিক কৃষিক্ষেত্র এবং ঘর গৃহস্থালি ও সন্তান পালনে জীবন ব্যয় করতেন। সন্তানও হতো বেশ কয়েকটি। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারতেন না। স্কুল অবধি শিক্ষার ফলে তাদের উন্নত কোনো পেশা বেছে নেওয়ারও তেমন সুযোগ ছিল না। কিন্তু গত কয়েক দশকে উইগুর নারীদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের হার অনেক বেড়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীও হচ্ছেন। বিভিন্ন পেশা গ্রহণ করছেন। উইগুর ও তাজিক নারীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে অনেক উদ্যোগও গ্রহণ করেছেন। গড়ে তুলেছেন অনেক প্রতিষ্ঠান। তাদের স্বাধীন উপার্জন বাড়ছে। সমাজে তাদের অবস্থানও পরিবর্তন হয়েছে অনেক। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। প্রজনন বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও অর্জিত হয়েছে। ফলে অনেক নারী নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনে সময় দিচ্ছেন। কমছে সন্তানের সংখ্যা। নারীরা ভাবছেন, দুটি বা তিনটি সন্তান হলে তারা নিজেদের জন্য অনেক বেশি সময় পাবেন, নিজেদের ক্যারিয়ারে উন্নতি ঘটাতে পারবেন। অনেকে এক সন্তানও গ্রহণ করছেন। চীনে এখন সবার জন্য তিন সন্তান নীতি; কিন্তু অনেক নারী স্বেচ্ছায় এক সন্তান নিচ্ছেন নিজের ক্যারিয়ারে উন্নতির জন্য। এই সিদ্ধান্ত যে তারা নিতে পারছেন স্বাধীনভাবে, এটা তাদের ক্ষমতায়নের পথে অনেক বড় বিষয় বলে আমার কাছে মনে হয়।
চীন সব নারীর জন্যই খুব নিরাপদ। মুসলিম নারীর জন্যও একইভাবে নিরাপদ এই দেশ। চীনের মুসলিম নারীরা তাদের জাতির ঐতিহ্যবাহী পোশাক যেমন পরেন, আবার পাশ্চাত্য ধারার স্কার্ট, টপস, গাউন, শার্ট, প্যান্ট ইত্যাদিও পরেন। অনেকে পাশ্চাত্যের পোশাকের সঙ্গে মাথায় স্কার্ফ ব্যবহার করেন। সব মুসলিম নারীই যে স্কার্ফ পরেন তা নয়। স্কার্ফ ছাড়াও প্রচুর মুসলিম নারী দেখেছি।
মসজিদে যখন একসঙ্গে জুমা পড়ি তখন দেখেছি, আমার মতো অনেকে স্রেফ ওড়না বা চাদর ধরনের একটি কাপড়ে মাথা ঢেকে রাখেন এবং মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর স্কার্ফ বা চাদর খুলে ফেলেন। বিয়ের সময় যার যার জাতির ঐতিহ্যবাহী কনের পোশাক পরেন। তবে এখন বিয়েতে পাশ্চাত্যের সাদা রঙের ওয়েডিং গাউন বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনেক মুসলিম নারী সাদা বা কালো টুপি পরেন।
উইগুর ও তাজিক নারীদের মধ্যে গানবাজনা ও নাচের পারদর্শিতা অনেক বেশি। তারা ১২ মুকামসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নাচে অংশ নেন। তাগ মেশরেপ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান রয়েছে। সেখানেও নারীদের অংশগ্রহণ খুব বেশি। আবার চীনের ঐতিহ্যবাহী ব্যালে নাচেও তারা অংশ নেন। মুসলিম নারীদের মধ্যে শিল্পী রয়েছেন প্রচুর।
তারা সেলাই ও এমব্রয়ডারিতেও খুব দক্ষ। বিশেষ করে তাজিক নারীরা এক ধরনের এমব্রয়ডারি করে থাকেন। উইগুর নারীরাও সিল্ক বুননে খুব পারদর্শী।
ঐতিহ্যবাহী রান্নাতেও নারীরা পারদর্শী। কুনমিংয়ের মুসলিম কমিউনিটির বেশিরভাগই হুই জাতিগোষ্ঠীর। হুই মুসলিম নারীরা উচ্চশিক্ষিত। তারা বিভিন্ন পেশায় রয়েছেন। জুমা পড়ার সূত্রে তাদের অনেকের সঙ্গেই বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
জুমার নামাজের পর নারীরা মুসল্লিদের মধ্যে নিজেদের তৈরি কেক, বিস্কুট, পিঠা, কাবাব ইত্যাদি খাবার বিতরণ করেন। চীনের একজন নাগরিক হিসেবে মুসলিম নারীরাও অন্য নারীদের মতোই পুরুষের সম-অধিকার ভোগ করেন।
লেখক : শিক্ষক, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


প্রতি দলিল ৫০০ টাকা করে চাঁদা দাবি বিএনপি নেতার