মাসুমার মাংসের আচার যাচ্ছে ১৭ দেশে

সিরাজুল ইসলাম

মাসুমার মাংসের আচার যাচ্ছে ১৭ দেশে

দায়িত্ব বড়ই অদ্ভুত—কখন যে কার ঘাড়ে এসে পড়ে, তা বলা মুশকিল। এই দায়িত্বই মানুষকে পথ দেখায়, নিয়ে যায় অনেক দূর। এ জন্য প্রয়োজন বল, একাগ্রতা, সততা, নিষ্ঠা আর কঠোর পরিশ্রম। তবেই সফলতার মুখ দেখা সম্ভব।

এমনই একজন সফল নারী উদ্যোক্তা মাসুমা আক্তার। তার মাংসের আচার বিশ্বজয় করেছে। তার হাতে তৈরি আচার ১৭ দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। এ থেকে মাসে তার আয় কত টাকা—তা শুনলে অনেকেরই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে। তিনি মাসে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় করেন। কীভাবে এই পথে পা বাড়ালেন তিনিÑসেই গল্পই আজ শোনাব।

বিজ্ঞাপন

বগুড়ার কইগাড়ি গ্রামের এক নিভৃত পল্লিতে মাসুমা আক্তারের বসবাস। তার স্বামী রাজিবুল ইসলাম চার তারকা হোটেলের হিসাব বিভাগে চাকরি করতেন। বেশ ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারি এসে সবকিছু তছনছ করে দেয়। অনেকের মতো তার স্বামীর চাকরিটিও চলে যায়। সংসারে নেমে আসে চরম অভাব। তবু তারা কোনো সুস্পষ্ট উত্তরণের পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চারদিকে যেন নেমে আসে অন্ধকার।

এমন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন মাসুমা। তিনি ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পুঁজি কোথায়? হাতে কোনো টাকা নেই, সঞ্চয়ও নেই। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। তার মতে, হেরে যাওয়া তার অভিধানে নেই।

তার মেয়ের একটি মাটির ব্যাংক ছিল। সেটি ভেঙে পাওয়া যায় ৩৫০ টাকা। এর মধ্যে ৫০ টাকা মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়ে বাকি ৩০০ টাকায় তিনি অনলাইনে আলুর চিপস বিক্রি শুরু করেন। এটাই ছিল তার যাত্রার শুরু।

তবে এই ব্যবসা খুব বেশি সফল হয়নি। এরপর তিনি অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু এ জন্যও তো টাকা দরকার—তা কোথায় পাবেন? সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তার মা। তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। ধীরে ধীরে চিপস ও কাপড়ের ব্যবসা উন্নতির বদলে ম্লান হয়ে আসছিল। কিন্তু দমে যাননি মাসুমা। তিনি ভাবতে থাকেন কী করা যায়।

ঠিক এ সময় শাশুড়ির কাছ থেকে পাওয়া পুরোনো রেসিপি—গরুর মাংসের আচার তৈরির কৌশল—তাকে নতুন করে প্রেরণা দেয়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু করেন কাজ। মাত্র দুই কেজি মাংস দিয়ে তৈরি করেন আচার এবং ছবিসহ ফেসবুকে পোস্ট করেন। প্রথম ব্যাচের আচার অনলাইনেই বিক্রি হয়ে যায়। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে।

এরপর তিনি ‘আরএম ফুড কর্নার’ নামে একটি নতুন ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যানারেই বর্তমানে তার ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে মাংসের আচার উৎপাদনের পরিমাণও বাড়াতে থাকেন মাসুমা। কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি সংগঠনও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে মাসুমা আক্তার প্রতি মাসে প্রায় ৬০০ কেজি মাংসের আচার তৈরি করে বিক্রি করছেন। এসব আচার দেশের সীমানা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, সৌদি আরবসহ ১৭টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। অর্ডার আসে অনলাইনে, প্রধানত প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির কাছ থেকে। ২০২১ সাল থেকে তিনি আচার রপ্তানি করছেন। তিনি জানান, এখন এক বা দুই মাস পরপর ১৫০ থেকে ২০০ কেজি আচার বিদেশে রপ্তানি করা হয়। তার নিজের কোনো রপ্তানি লাইসেন্স না থাকায় পরিচিত একজনের লাইসেন্স ব্যবহার করতে হয়। বিদেশে মাংসের আচারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং এ থেকে তার মাসিক লাভ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা।

মাসুমা শুধু মাংসের আচারেই থেমে নেই। তিনি গরুর ভুঁড়ি, পায়া, লাচ্ছা সেমাই ও ঘি উৎপাদন ও বিক্রিও করছেন। এ কাজে তাকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করছেন স্বামী ও সাতজন কর্মচারী।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছেন। প্রবাসী তিন বন্ধুর সঙ্গে মিলে এ বছর নিউ ইয়র্কে ‘দেশ বাংলা ডিস্ট্রিবিউটর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি। তার উৎপাদিত ১৮টি পণ্য এখন এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। গরুর মাংস ছাড়াও খাসি, মুরগি, রসুন, জলপাই ও বিভিন্ন মৌসুমি ফলের আচার তৈরি করেন তিনি। আচার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় প্রিমিয়াম মানের মাংস, যা হাড় ও চর্বি আলাদা করে পরিষ্কারভাবে সিদ্ধ করা হয়। এরপর সরিষার তেলে নিজস্ব বিশেষ মসলায় মাংস ভাজা হয়। মাসুমার আচার তাই ভিন্ন স্বাদের, স্বাস্থ্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী।

উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্তই তার জীবন বদলে দিয়েছে বলে জানান মাসুমার স্বামী রাজিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মাংসের আচারে সফলতা পাওয়ার পর নতুন করে আর কোথাও চাকরিতে যোগ দিইনি। এখন আরএম ফুড কর্নারের যাবতীয় দেখাশোনা করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘একসময় মায়ের হাতে রান্না করা মাংসের আচার খেতাম। এখন ব্যবসার পাশাপাশি সেই আচার খেতে পারছি। আচার খেতে গিয়ে মায়ের হাতে রান্না করা মাংসের আচারের কথা মনে পড়ে যায়, সেই স্বাদের কথাও মনে পড়ে যায়। এখন আমাদের সঙ্গে সাতজন কর্মচারী কাজ করেন। আমরা ব্যবসার পরিধি আরো বাড়াতে চাই।’

বিসিক বগুড়ার উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, মাসুমা তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ সফল উদ্যোক্তা। তার এই সফলতা দেখে অনেক নারী উদ্যোক্তা বাসায় থেকে কাজ শুরু করেছেন।

মাসুমার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বগুড়া চেম্বার অব কমার্স। চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, মাসুমার তৈরি মাংসের আচার সারা দেশে সুনাম কুড়িয়েছে। এই আচার বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে চেম্বার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন