শিমুল-পলাশের আগুনরঙা ফুল, আমের মুকুলের ম-ম ঘ্রাণ আর কোকিলের কুহুতানে প্রকৃতি জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে- বসন্ত এসে গেছে। শীতের রিক্ততা মুছে আজ পয়লা ফাল্গুনে প্রকৃতি আর মানুষের হৃদয় দুটোই সেজেছে নতুন রঙে।
এ বছর বসন্ত এসেছে ভিন্ন বাস্তবতায়, তবুও তার উচ্ছ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই। কারণ বসন্ত মানেই প্রেম, আর প্রেম মানেই জীবনের নবজাগরণ। আজ একই সঙ্গে বসন্তবরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তাই ফাল্গুনের প্রথম দিনে ভালোবাসার জয়গান গাইছে তরুণ-তরুণীরা।
গাছে গাছে ফুটেছে রঙিন ফুল। বাতাসে আর শীতের কাঁপন নেই, বরং এক ধরনের আরামদায়ক উষ্ণতা। দূর থেকে ভেসে আসে ফুলের সুবাস, মনকে করে তোলে প্রফুল্ল। প্রকৃতির এই রূপান্তর যেন মনে করিয়ে দেয়- ঋতুরাজ বসন্তের আগমন রাজকীয়ই হয়। তাই তো তাকে স্বাগত জানাতে শিমুল, পলাশ আর অশোক শাখায় শাখায় সাজিয়েছে ফুলের ডালি।
বসন্ত শুধু প্রকৃতিতেই নয়, মানুষের মনেও আনে নতুনের বার্তা। নারীদের খোঁপায় ফুল, বাসন্তী শাড়ি, কপালে লাল টিপ- সব মিলিয়ে বসন্তের সাজে বসন্তকেই যেন হার মানান তারা।
পুরুষদের মনেও লেগেছে ফাল্গুনের রঙ- হলুদ বা রঙিন পাঞ্জাবিতে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। বসন্ত যে প্রেমের ঋতু, তা যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়। তাইতো গানের কথায় ফিরে আসে- অনুপম রায়–এর কণ্ঠে, “বাতাসে বহিছে প্রেম…”।
শনিবার পয়লা ফাল্গুন- বাংলা ঋতুচক্রে বসন্তের প্রথম দিন। বসন্তকে বলা হয় ‘ঋতুরাজ’। তার আগমন প্রকৃতিকে যেমন রাঙায়, তেমনি দোলা দেয় হৃদয়েও। বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস এবারও এসেছে হাত ধরাধরি করে। ফলে আজকের দিনে আনন্দের মাত্রা যেন আরও বেড়ে গেছে।
তবে এ বছর বসন্ত উৎসবের আবহ কিছুটা ভিন্ন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতায় চিরাচরিত একুশের বইমেলা নেই। ফলে ফাগুনের রং আর নতুন বইয়ের গন্ধ একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত নগরবাসী। তবুও বসন্তবরণ থেমে নেই।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতিবছর ১ ফাল্গুন 'জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ' আয়োজন করে বসন্ত উৎসব। এ বছরও ‘বসন্ত উৎসব ১৪৩২’ আয়োজন করেছে সংগঠনটি। তবে আগের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- এর চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় নয়; উৎসবের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর- এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে।
সকালে বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়- এর শিক্ষার্থীদের সমবেত যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। দিনভর নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা, একক সংগীত, আবৃত্তি, শিশু-কিশোর ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাজানো হয়েছে আয়োজন। বসন্ত কথন পর্বে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ। বক্তব্য দেন সহসভাপতি কাজল দেবনাথ ও সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।
বসন্ত এলে প্রকৃতি নিজেও যেন প্রেমে মেতে ওঠে। নতুন পাতা, ফুল আর দখিনা বাতাস- সবই প্রকৃতির প্রেমের প্রকাশ। আম্রকাননে মৌ মৌ গন্ধ, ভ্রমরের গুনগুনানি আর প্রজাপতির উড়ে বেড়ানো- সব মিলিয়ে বসন্ত মানেই মিলনের ডাক। কবির ভাষায়, বসন্ত শুধু ফুলের নয়, হৃদয়েরও উৎসব। তাইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন-
“আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…”।
তবে ইটপাথরের নগরীতে বসন্ত অনেকটাই উৎসবেই সীমাবদ্ধ। শহরের যান্ত্রিকতায় বসন্তের রাজকীয়তা পুরোটা ধরা পড়ে না। গ্রামে গেলে বোঝা যায় কেন বসন্ত ‘ঋতুরাজ’।
সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই- ঝোপের বুনোফুল, পথের ধারে শিমুলগাছ, পুকুরপাড়ের বাতাস- সবই বসন্তের ক্যানভাস। শহরে এমন দৃশ্য বিরল হলেও আজ বসন্ত। ঠিক যেমনটি বলেছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়-
“ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত…”।
আজ একই সঙ্গে বসন্তবরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তাই ফাল্গুনের প্রথম দিনে ভালোবাসার জয়গান গাইছে তরুণ-তরুণীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিল কিংবা রমনা পার্ক- সর্বত্রই তারুণ্যের ঢল, মানুষের বিচরণ। ঢাকার বাইরেও জেলা শহর, ক্যাম্পাস আর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বসন্তের রঙে রাঙা মানুষের ভিড়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত উপভোগ করা এক প্রেমিকযুগল আমার দেশকে বলেন, দুদিন আগে ভোট উৎসবের পর এবার বসন্ত উৎসব একই সাথে ভালোবাসা দিবস নতুন এক আবহ তৈরি করেছে। এবারের বসন্ত যেন বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার বার্তা দিচ্ছে। যে বাংলাদেশ হবে বসন্তের মতো প্রাণবন্ত, যে বাংলাদেশ হবে ভালোবাসা দিবসের মতো সৌহার্দে সিক্ত।
বসন্ত মানেই জড়তা ঝেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। শীতের রিক্ততা মুছে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেমন নতুন প্রাণে জেগে ওঠে, তেমনি মানুষের মনেও জাগে নতুন আশার আলো। শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা মিলেমিশে আজ একাকার। গাছে গাছে যেন শুধু একটাই বার্তা- বসন্ত এসে গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

