আগৈলঝাড়া থানায় হামলায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

Waich Quruni
ওয়াসিম সিদ্দিকী

আগৈলঝাড়া থানায় হামলায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এক আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা সক্ষমতাকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে শুরু করে চলতি বছর নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত প্রায় দুই বছর সময়ের মধ্যে দেশের কোথাও এভাবে কোনো সুরক্ষিত থানায় হামলার ঘটনা ঘটেনি।

বিজ্ঞাপন

আগৈলঝাড়া থানায় গত বৃহস্পতিবার স্রেফ একটি মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন হামলা, ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের রক্তাক্ত করার ঘটনার প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পুলিশ বাহিনী কেন এখনো পূর্ণোদ্যমে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারছে না, তা ভাবনার বিষয়।

এ ব্যর্থতার মূলে বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলগত দুর্বলতা, নাকি মাঠপর্যায়ের পৃথক টিম ম্যানেজমেন্ট ও রেসপন্স টিমের সমন্বয়হীনতা, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে এ ধরনের তথ্য দিয়েছেন। আগৈলঝাড়ার ঘটনা শুধু একটি থানায় হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে জনতাকে উসকে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা—এ তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, একটি ভিত্তিহীন গুজবকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি পরিকল্পিতভাবে সহিংস রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় অন্তত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে কয়েকজন নারীও রয়েছেন। গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন এবং সরকারসমর্থক রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

গুজবকে উসিলা করে আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ

তদন্তের গভীরতায় যতই যাওয়া যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, এ হামলা কোনো আকস্মিক সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। মূলত চুরির মামলার এক আসামির অসুস্থতার খবরকে পুঁজি করে এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করেছে দুটি ভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এলাকায় পুলিশের মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা একটি বড় মাদক সিন্ডিকেট এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাভোগী সমর্থক এ সুযোগ সুকৌশলে লুফে নেয়। ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে নিজেদের অপরাধের সাম্রাজ্যকে আড়াল করা।

হাজতের ঘটনা ও আসামির প্রকৃত অবস্থা

ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার। ওইদিন চুরির মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে গ্রেপ্তার করে আগৈলঝাড়া থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। প্রশাসনের দাবি, তীব্র মাদকাসক্ত রিয়াজ লকআপে থাকাকালীন আচমকা অবিন্যস্ত আচরণ শুরু করেন এবং নিজের মাথায় নিজে আঘাত করে জখম হন। ডিউটি অফিসাররা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্রথমে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) ভর্তি করেন। কিন্তু রিয়াজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থাতেই পর্দার আড়ালে থাকা কুশীলবরা ভিন্ন চাল চালতে শুরু করে।

ফেসবুক লাইভ ও অপপ্রচার

আসামি রিয়াজ যখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, ঠিক তখনই পরদিন বৃহস্পতিবার হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে এলাকায় পরিকল্পিতভাবে রটিয়ে দেওয়া হয়—‘পুলিশের নির্যাতনে রিয়াজ হাজতেই মারা গেছেন।’ এ স্পর্শকাতর অপতথ্যকে হাতিয়ার করে মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ মানুষকে উত্তেজিত করে থানার সামনে জড়ো করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জনতা মারমুখী রূপ নেয় এবং থানা লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ ভাঙচুর শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য রক্তাক্ত ও আহত হন। পরবর্তী সময়ে জেলা সদর থেকে অতিরিক্ত ফোর্স গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেপ্তার ১৮

হামলার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টিম ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং ঘটনার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট ও ফেসবুক লাইভ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করেছে। হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপকারী এবং পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে এ পর্যন্ত অন্তত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, গ্রেপ্তারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারীও রয়েছেন। গোয়েন্দাদের দাবি, পুলিশের ওপর হামলার সময় এ নারীদের মূলত মানবঢাল হিসেবে সামনের সারিতে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে পুলিশ পাল্টা কোনো কঠোর অ্যাকশনে যেতে দ্বিধাবোধ করে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হামলার আগে ও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, ফেসবুক লাইভ, বিভিন্ন পোস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কারা প্রথম গুজব ছড়িয়েছে, কারা জনতাকে সংঘবদ্ধ করেছে এবং কারা হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজও চলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, হামলার পেছনে শুধুই তাৎক্ষণিক ক্ষোভ নয়, বরং সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির একটি পরিকল্পিত চেষ্টা ছিল কি না—সেটিও তদন্তের অংশ। এ কারণে শুধু হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নয়, গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কঠোর বার্তা

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আইনি কঠোরতার বার্তা পাওয়া যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, ইস্যু যাই হোক না কেন, পুলিশ সব সময় প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আগৈলঝাড়ার ঘটনার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক, কিংবা তারা রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্র কাউকেই দেয়নি। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতেই হবে।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্বেগ

একটি স্রেফ ভিত্তিহীন গুজবকে পুঁজি করে রাষ্ট্রীয় একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য ও নগ্ন হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শামীমা পারভীন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, একজন অসুস্থ আসামির সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে পুলিশ যেখানে মানবিক ও আইনি দায়িত্ব পালন করল, সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলার ওপর আঘাত হানা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এ ঘটনাটি দেশে সাম্প্রতিক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উদ্বেগজনক ‘মব সংস্কৃতির’ এক নোংরা বহিঃপ্রকাশ। তথ্য যাচাই না করে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং সামগ্রিক জননিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।

ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও চলমান অনুসন্ধান

থানাপুলিশ জানিয়েছে, সরকারি কাজে বাধা, দাঙ্গা সৃষ্টি, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তারদের আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। একই সঙ্গে এ তাণ্ডবের পেছনে আর কোনো বড় ধরনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা অর্থদাতা পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের একাধিক বিশেষায়িত গোয়েন্দা ইউনিট মাঠে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ করা হবে না, তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যারা এ গুজবের ডালপালা ছড়িয়েছে, তাদের প্রত্যেককে সাইবার আইনের আওতায় আনা হবে। আগৈলঝাড়া থানা হামলার ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের চিত্র নয়; এটি গুজব মোকাবিলা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুলিশের তাৎক্ষণিক মানসিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক সচেতনতার এক বড় পরীক্ষা। নির্বাচিত সরকার আসার পরেও কেনো পুলিশের মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এ ধরনের বড় জমায়েতের আগাম তথ্য পেতে ব্যর্থ হলো, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক কৌশল এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন