ডিআইজি আনিসের ‘জঙ্গি নাটক’ ৯ বছর পর নির্দোষ চার পরিবার

আবু সুফিয়ান, যশোর থেকে ফিরে

ডিআইজি আনিসের ‘জঙ্গি নাটক’ ৯ বছর পর নির্দোষ চার পরিবার
ফাইল ছবি

যশোরে চার পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘জঙ্গি’ নাটক মামলা দীর্ঘ ৯ বছর পর শেষ হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর সম্প্রতি আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দিয়েছে। এ মামলায় ভুক্তভোগী তানজির আহমেদ, মো. মহিউদ্দিন, মেহেদী হাসান পাশা ও সাদ্দাম ইয়াসির সজলের জীবন ও ক্যারিয়ার তছনছ হয়ে গেছে।

তাদের অভিযোগ, এ মামলার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছেন যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্দেশে তরুণদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলার পাশাপাশি আবু সাঈদ নামে বিএনপির এক কর্মীকে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত এ হত্যার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট যশোরে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আবু সাঈদের স্ত্রী পারভীন খাতুন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান আহমেদ অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের খুলনা রেঞ্জ ডিআইজিকে (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল) নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি যশোরের ধর্মতলা এলাকায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

বিতর্কিত কর্মকর্তা আনিসের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ‘পলায়নের’ অভিযোগে তাকে গত বছরের ৩০ জুলাই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

আনিস ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ যশোরের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

পলাতক থাকায় অভিযোগের বিষয়ে আনিসের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। যশোরে কর্মরত অভিযুক্ত ডিবি ও থানাপুলিশের সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের সন্ধানও মেলেনি।

তানজিরের পরিবারের ওপর নির্যাতন

তানজিরের পরিবারের নারী-শিশুসহ কোনো সদস্যই বাদ যায়নি পুলিশের সাজানো মামলার হয়রানি থেকে। ভুক্তভোগী তানজির জানান, ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাদের বাড়িতে হানা দেয় ডিবি পুলিশ। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পুলিশ তার বড়ভাইকে তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেয়। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যদের তালিকা তৈরি করে পুলিশ তার দুই বোন এবং তাদের স্বামীদেরও সাজানো মামলায় আসামি করে।

তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালের রমজানের এক রাতে পুলিশ আবারও তাদের বাড়িতে হানা দেয়। পুলিশ তাকে এবং তার মেজো বোনকে তিন বছরের বাচ্চাসহ ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। দীর্ঘ হয়রানি ও বন্দিদশায় জেলখানায় বসেই এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন তানজির। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেলেও পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও ভয়ভীতি তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।

পুলিশের মামলার অভিযোগে বলা হয়, তারা অভয়নগরের একটি মাদরাসায় গোপন মিটিং করছিলেন। মামলায় তানজির, তার ভাই, দুই বোন ও দুলাভাইসহ পরিবারের সাত সদস্যকে আসামি করা হয়। জেল থেকে জামিনে বের হওয়ার পরও পুলিশ জেলগেট থেকে পুনরায় তানজিরকে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। একই সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, জামিন পাওয়ার পর তানজির পলাতক। পরবর্তী সময়ে ঢাকা থেকে তার বড়ভাই ও মেজো বোনকে ধরে নিয়ে প্রায় ৪৫ দিন আটকে রাখা হয়। শেষে পুলিশ তাদের দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে ‘স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ’-এর নাটক সাজায়। তারা দীর্ঘ হয়রানির শিকার হন। তানজির, তার ভাই, দুই বোন ও এক দুলাভাইকে কারাভোগ করতে হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের এ অমানবিক ভোগান্তির অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট। হাসিনার পতনের পর আইনি লড়াই শেষে তানজিরের পরিবারের সদস্যরা সব মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

মহিউদ্দিনের পরিবারের বিভীষিকাময় দিন

চাঁচড়া পশ্চিমপাড়ার মো. মহিউদ্দিন এবং তার পরিবারও এ ‘জঙ্গি’ নাটকের শিকার। ২০১৬ সালে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলা দিয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসের নির্দেশে তার স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মহিউদ্দিনের অভিযোগ, তার নববধূকে তুলে নিয়ে ডিভোর্স দিতে চাপ দেয় ডিবি পুলিশ। এমনকি মহিউদ্দিনের বাবাকেও গ্রেপ্তার করে একই জঙ্গি মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মহিউদ্দিনের বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ও স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন। ৩৬ বছর বয়সি মহিউদ্দিন সরকারি চাকরির সুযোগ হারিয়ে বর্তমানে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। আদালতের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণে এ পরিবারটিও মামলা থেকে বেকসুর খালাস পায়।

পাশাকে ক্রসফায়ারের হুমকি

২০১৫ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান পাশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ১১ দিন ডিবি হেফাজতে চোখ বেঁধে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। পাশার অভিযোগ, পুলিশের চরম হুমকিতে তাকেসহ অন্যদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়।

তার ভাষায় ১৫-২০ জন পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে ব্যাপক মারধর ও নির্যাতন করত। এক রাতে অভিযানের কথা বলে তাকে পুরো শহর ঘুরিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।

তিনি জানান, জামিন পেলেও দীর্ঘ ৯ বছর তাকে পুলিশের কড়া নজরদারিতে থাকতে হয়। যশোরের বাইরে যাওয়া ছিল নিষিদ্ধ। নিয়মিত পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে অপরিচিত ব্যক্তিরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করত। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর তাকে সব মামলা থেকে খালাস দেয় আদালত।

আরেক ভুক্তভোগী সজলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তার স্ত্রী ও ছয় বছর বয়সি সন্তানকে তুলে নেয়। পুলিশের দুর্ব্যবহারে সে শিশু আজও ট্রমার শিকার। সজলের স্ত্রী তখন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

মামলাগুলোর আইনি দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৯ বছর ধরে কেন চলল? এমন প্রশ্নের জবাবে ভুক্তভোগী পাশার আইনজীবী মো. মাহমুদ কবীর কাকন বলেন, ‘তখনকার সরকারের চাপে পড়ে বিচারকের কিছুই করার ছিল না।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। এরপর থেকেই আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি ডিআইজি আনিসকে। গোপালগঞ্জের সন্তান আনিসের স্ত্রী ফাতেমা তুজ্জহুরা শ্যামলী ছিলেন সংরক্ষিত আসনের এমপি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন