দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত সাড়াদান কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর’ এবং ‘বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরকে’ একীভূত করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন আনা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠান দুটি সরাসরি দুর্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও পৃথক মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় মাঠপর্যায়ে এক ধরনের তালগোল পাকিয়ে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সার্বিক দিক বিবেচনা করেই সরকার এ দুটি অধিদপ্তরকে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্রমতে, বর্তমানে আন্তঃসংস্থা টানাপোড়েন, আদেশের ঐক্য ও আইনি বাধ্যবাধকতার অভাব এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সমন্বয় কাঠামো বাস্তবে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের স্বার্থেই এ দুটি অধিদপ্তরকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। তাছাড়া ভারত, নেপাল, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ফায়ার সার্ভিস একই মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত হয়ে আসছে।
এর আগে গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই এ দুটি অধিদপ্তর দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন আনার জন্য প্রস্তাব পাঠানোর পরামর্শ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান আমার দেশকে বলেন, দুর্যোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ফায়ার সার্ভিস ও আবহাওয়া অধিদপ্তর। শুধু বাংলাদেশ ছাড়া অনেক দেশেই এ দুটি অধিদপ্তর দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সমস্যাগুলো উল্লেখ করে চিঠি পাঠিয়েছি। এখন সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী। যদি এ দুটি প্রতিষ্ঠান দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হয়, তবে একক নির্দেশনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের দুর্ভোগ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ মন্ত্রণালয় দেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, দুর্যোগে সাড়াদান, জরুরি ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ কাজে ফায়ার সার্ভিস ও আবহাওয়া অধিদপ্তর সহযোগিতা করলেও ফায়ার সার্ভিস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত। ফলে দুর্যোগের পূর্বাভাস, তাৎক্ষণিক সাড়া প্রদান, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে বড় ধরনের সমন্বয়জনিত সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়।
অনুরূপভাবে ফায়ার সার্ভিসের মিশন ও ভিশন হলো অগ্নিকাণ্ডসহ সব দুর্যোগ মোকাবিলা, উদ্ধার অভিযান ও নাগরিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে উদ্ধারকাজের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ফায়ার সার্ভিসকে দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় সেসব যন্ত্রপাতি তাদের ‘টিওঅ্যান্ডইতে’ অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। ফলে যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দেয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ফায়ার সার্ভিস ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে দুর্যোগের প্রস্তুতি, প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধারসহ সব ধাপে একটি একীভূত চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, বন্যা বা ঝড়ের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মাঠপর্যায়ের উদ্ধার তৎপরতা দ্রুততর হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। অগ্নিনিরাপত্তা ও আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউসহ সংশ্লিষ্ট নীতিগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে।
বাজেট বরাদ্দ, আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় এবং উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম একই ধারায় পরিচালিত হবে। এর ফলে দেশের জাতীয় দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া কাঠামো আরো শক্তিশালী হবে, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়বে এবং জনসুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের আওতায় এলে আগাম সতর্কবার্তা (ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, ভারী বর্ষণ, বজ্রপাত ও ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ) সরাসরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে স্থানান্তর, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতকরণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে। পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে মাঠপর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। এমনকি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, রাডার আধুনিকায়ন ও কমিউনিটি সতর্কীকরণ প্রকল্পসমূহ একীভূতভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই কমাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে জাতীয় দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধি করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


