শ্রাবণের বৃষ্টিতে বেড়েছে সৌন্দর্য, মুগ্ধ যাত্রীরা

ফুলে ফুলে রঙিন ঢাকা–ভাঙ্গা-খুলনা এক্সপ্রেসওয়ে

ফুলে ফুলে রঙিন ঢাকা–ভাঙ্গা-খুলনা এক্সপ্রেসওয়ে
ফুলে ফুলে রঙিন ঢাকা–ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি: আমার দেশ

পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে নতুন মাত্রা পেয়েছে ঢাকা–ভাঙ্গা–খুলনা এক্সপ্রেসওয়ে। দ্রুত ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগের পাশাপাশি এখন এই মহাসড়ক পরিচিতি পেয়েছে এক ভিন্ন পরিচয়ে ফুলের মহাসড়ক হিসেবে। বর্ষা, বিশেষ করে শ্রাবণের বৃষ্টিতে মহাসড়কের বিভাজকজুড়ে ফুটে থাকা লাল, গোলাপি, সাদা, নীল, হলুদ ও বেগুনি রঙের বাহারি ফুল যেন পুরো পথকে রাঙিয়ে তুলেছে। প্রকৃতির এই অপরূপ সাজ প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে দিচ্ছে এক অনন্য ভ্রমণ আনন্দ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু পার হয়ে মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় প্রবেশ করতেই বদলে যায় পথচলার দৃশ্যপট। এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে সারি সারি সবুজ গাছ আর মাঝের বিভাজকজুড়ে ফুটে থাকা বাহারি ফুল যেন ব্যস্ত মহাসড়ককে রূপ দিয়েছে এক বিশাল ফুলের উদ্যানে। বিশেষ করে শিবচরের পাচ্চর, সূর্যনগর, কাঁঠালবাড়ী, মাদবরচর ও কুতুবপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি ফুল ফুটেছে। কাঞ্চন, করবী, গন্ধরাজ, কুর্চি, রাধাচূড়া, জারুল, কামিনী, বেলি, সোনালু, কৃষ্ণচূড়াসহ নানা প্রজাতির ফুল দেখা যায় পুরো মহাসড়কে।

বিজ্ঞাপন

ফুলগাছে সাজানো ঢাকা–ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি: আমার দেশ
ফুলগাছে সাজানো ঢাকা–ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি: আমার দেশ

গ্রীষ্মের পর বর্ষার মৃদুমন্দ বাতাসে ফুলের পাপড়ি উড়ে এসে পড়ছে চলন্ত গাড়ির ওপর। কখনো জানালা দিয়ে, কখনো বাতাসে ভেসে আসা ফুলের সুবাস যেন দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর করে দেয়। মহাসড়কের দুপাশে কৃষ্ণচূড়া, জলপাই, অর্জুন, কাঁঠাল, মেহগনি, শিশু, আকাশমণি, চালতা, নিম, একাশিয়া ও হরীতকীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সবুজের এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি করেছে।

ব্যস্ত এই মহাসড়কে যানজট তৈরি হলে অনেক যাত্রী গাড়ির জানালা দিয়ে কিংবা নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে এসব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। অনেকের কাছে এটি এখন দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

মাদারীপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. শাহ আলম বলেন, ‘ব্যবসার কাজে প্রায়ই এই সড়কে চলাচল করি। ঢাকা থেকে ভাঙা পর্যন্ত ডিভাইডারে নানা প্রজাতির ফুল দেখে আমি মুগ্ধ। সুযোগ পেলেই গাড়ি থামিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে রাখি। ফুল মানুষের মনকে আনন্দ দেয়। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিও অনেকটা দূর হয়ে যায়।’

এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে নিয়মিত মোটরসাইকেলে যাতায়াতকারী ভাঙ্গা এলাকার ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মোটরসাইকেল থামিয়ে খুব কাছ থেকে ফুলের সৌরভ নিই। মনে হয় কারও মন খারাপ থাকলেও এই মহাসড়ক দিয়ে চলার সময় এমন দৃশ্য দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।’

শিবচরের কলেজ শিক্ষার্থী হাসান ফরাজি বলেন, ‘শুধু যাত্রীদেরই নয়, আমাদেরও মন ভরে যায়। আমরা বন্ধুদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। প্রকৃতির এত সুন্দর পরিবেশ খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।’

সূর্যনগর এলাকার পথচারী সোহেল রানা বলেন, ‘এক্সপ্রেসওয়ের পুরো মহাসড়ক এখন ফুলের মেলায় পরিণত হয়েছে। এই সৌন্দর্যের কারণে আমাদের এলাকার গুরুত্বও বেড়েছে।’

শিবচরের পাচ্চর এলাকার বাসিন্দা শিক্ষক শাহিন আহমেদ বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমরা এই ফুলের বাগানের পাশ দিয়ে চলাচল করছি। একেক মৌসুমে একেক ধরনের ফুল ফোটে। প্রতিদিনই নতুন এক সৌন্দর্য আমাদের চোখে পড়ে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শিবচর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘মহাসড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দুইপাশে এবং বিভাজকে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। এর ফলে শুধু সৌন্দর্যই বাড়েনি, পুরো এলাকাই আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এখানে দিনে দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে।’

মাদারীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, খ ম নকীবুল বারী বলেন, ‘সড়কের সৌন্দর্য বাড়াতে নানা রকম ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। সড়কের পরিবেশ ও যাত্রীদের মনোরম অভিজ্ঞতা তৈরির জন্য এগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। মহাসড়কের বিভাজকে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছে একদিকে নানা বর্ণের ফুল সড়কের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, অপরদিকে বিপরীত দিক থেকে আসা হেডলাইটের আলো অন্য লেনের গাড়ির ওপর পড়ছে না। দুর্ঘটনা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসব ফুলের গাছ। আবার পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করছে। সড়ক সৌন্দর্য রাখতে আমাদের পক্ষ থেকে নানাবিধি গাছ লাগানো হবে। এবং তা পরিচর্যা পর্যবেক্ষণ করার জন্য লোক নিয়োজিত আছে ।’

এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘ধুলাবালি ও শব্দদূষণ কমানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং বিভাজক দখলমুক্ত রাখতেও এসব গাছ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে এসব গাছের রক্ষণাবেক্ষণ আরও জোরদার করতে ডিভাইডারের দুপাশে রেলিং স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।’

শিবচর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘ফুল মানুষের মনকে পুলকিত করে। বিভাজকে ফুলের এমন সমারোহ মহাসড়ককে যেমন নান্দনিক করেছে, তেমনি দীর্ঘ যাত্রাকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলেছে। এই সৌন্দর্য যাতে কেউ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও নজরদারি করা হচ্ছে।

তবে প্রকৃতির এই অপূর্ব সৌন্দর্যের আড়ালে বাড়ছে উদ্বেগও। সামাজিক মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিনই এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন অংশে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে ডিভাইডারের ওপর উঠে কিংবা মহাসড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।’

এ ছাড়া কিছু অসচেতন ব্যক্তি ফুল তুলতে গিয়ে গাছের ডাল ভেঙে ফেলছেন, কেউ আবার ফুলের বাগানে উঠে ছবি তুলতে গিয়ে নষ্ট করছেন গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বহু যত্নে গড়ে তোলা এই নান্দনিক পরিবেশ।

সচেতন পরিবেশবিদদের মতে, মহাসড়কের বিভাজকে ফুল ও সবুজায়নের এমন উদ্যোগ শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বায়ুদূষণ কমানো, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ হ্রাস এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রয়োজন প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহখ্যাত ঢাকা–খুলনা এক্সপ্রেসওয়ে এখন আর কেবল একটি যোগাযোগপথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতি, সৌন্দর্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার এক অনন্য উদাহরণ। তবে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন কেউ নিজের জীবন কিংবা অন্যের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না ফেলেন এটাই সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন