গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস ৩০ অগাস্ট । ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ’টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এটি কার্যকর হয়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী সরকার সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করে। এই সময়ে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বীসহ সাধারণ নাগরিকরা গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন।
গোপন বন্দিশালাগুলোতে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরোধীতাকারী এবং ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে মূলত যাঁরা সোচ্চার ও প্রতিবাদী হতেন তাঁদের গুম করে নির্যাতন করা হতো। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদি হাসিনা সরকারের পতন হয়। ৮ অগাস্ট ২০২৪ এ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর ২৯ অগাস্ট গুম হতে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ বাংলাদেশ অনুমোদন করে।
এই সনদ অনুমোদনের ফলে গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় এবং অর্ন্তবর্তী সরকার 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি করে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ সংসদে পাশ না করায় অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায়। গত ৩ অগাস্ট মন্ত্রীসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ অনুমোদন করেছে। মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল পুলিশকে।
গত ২৭ অগাস্ট এই খসড়া আইনের কিছুটা পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। এই আইনের ১৪ (৩) ধারায় বলা হয়েছে শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী পরিচালনা করতে পারবে না এবং এক্ষেত্রে সরকার উক্ত অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো বাহিনী বা আন্ত: বাহিনীর তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করতে পারবে। কিন্তু এটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কারণ, পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হবে।
বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সরকার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে এবং তাদের তদন্ত প্রায়শই: পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রতিভাত হয়েছে। অধিকার এবং গুম সংক্রান্ত ইনকোয়ারি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে গুমের ক্ষেত্রে এক বাহিনী আরেক বাহিনীর নামে মানুষকে তুলে নিয়ে যেত। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের আগে কোন বাহিনী গুম করেছে সেটা কখনোই জানা সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে এই আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী তদন্তের মধ্য দিয়ে অভিযোগটি আদালতে মিথ্যা বিবেচিত হলে অভিযোগকারীর ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। ফলে তা বিচারহীনতার পথকে আরো প্রশস্ত করবে এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার গুমের অভিযোগ দায়ের করতে নিরুৎসাহিত হবে। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ এ এই ধরনের মামলার তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গুমের ঘটনা ঘটেছে, যা গুমের শিকার ব্যক্তি, পরিবার এবং মানবাধিকার কর্মীদের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ ঘটিয়েছে। সরকারের কাছে অধিকার তিনটি দাবি জানিয়েছে। দাবিগুলো হলো—
১. গুমের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার দিতে হবে এবং তা আইনে উল্লেখ করতে হবে।
২. গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেনি, তাদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। এই সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


