‘শেখ হাসিনা পালায় না’—দম্ভপূর্ণ ও আলোচিত এই বক্তব্য পতিত স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রীর মুখে আজকের দিনে শুনতে হয়েছিল। তীব্র আন্দোলনের মুখে নাজেহাল অবস্থায় শেখ হাসিনা এদিন ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বসেন। সেখানেই এ কথা বলেন তিনি। ব্যবসায়ীরাও সে সময় তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
২০২৪ সালের এই দিন আদালতের নির্দেশে সরকারি চাকরিতে ৭ শতাংশ কোটা রেখে প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে অনুমোদন দেন শেখ হাসিনা। এতে বলা হয়, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরির সব গ্রেডে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে ৯৩ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ নিয়োগ হবে কোটার ভিত্তিতে। বাকি পদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করেন।|
এর আগে টানা তিন দিন ইন্টারনেট বন্ধ রেখে জনগণকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল শেখ হাসিনার সরকার। এর মাঝেই গণহত্যা চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। পাশাপাশি ছিল ধরপাকড় ও লাশ গুম। কারফিউ সামান্য শিথিল হলেও রাজধানীসহ সারা দেশে বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, শেরেবাংলা নগর, মিরপুর, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেনা, পুলিশ ও সাদা পোশাকধারীদের দমন-পীড়ন চলতে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ অন্তত ২১ জন নিহত হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী, মাদরাসাছাত্র, বিক্ষোভকারী ও সাধারণ পথচারীদের ওপর চালানো হয় গুলি, গ্রেপ্তার ও চরম নির্যাতন। ঢাকায় দেখা যায়, স্বজনের লাশ খুঁজতে পথে পথে ছুটছিলেন মানুষ, হাসপাতালে ছড়িয়ে ছিল রক্তাক্ত দেহ।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা ধাপে ধাপে চালু করা হয়। ২২ জুলাই অগ্রাধিকারভিত্তিতে আংশিক চালুর পর ২৪ জুলাই থেকে সম্পূর্ণরূপে চালু করা হবে বলে জানানো হয়।
এদিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম গুম থেকে উদ্ধারের পর চিকিৎসা শেষ না করেই হাসপাতাল ছাড়েন। নাহিদকে ১৯ জুলাই তুলে নিয়ে যায় সরকারি বাহিনী। সেখানে তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। তাকে রড দিয়ে পেটানো হয়। ২১ জুলাই তাকে পূর্বাচলের রাস্তায় ফেলে যায় ডিবির সদস্যরা। তিনি একা বাড়ি ফেরেন এবং পরে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি হন।
এছাড়া আন্দোলন দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউএন (ইউনাইটেড নেশনস) লেখা সাঁজোয়া যানের ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করে। ওই আন্দোলনে জাতিসংঘের এই উদ্বেগের তীব্র প্রভাব পড়ে।
এদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস উপায়ে দমনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর জন্য উল্টো বিএনপি-জামায়াতকে সরাসরি দায়ী করেন। তিনি বলেন, এই রাজনৈতিক জোট সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং পরিকল্পিতভাবে দেশব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় পালানোর গুজব প্রত্যাখ্যান করে হাসিনা বলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’।
সেদিন ব্যবসায়ী নেতারাও শেখ হাসিনাকে একবাক্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান। এতে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইতোমধ্যে ১৬ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে তিন শতাধিকে পৌঁছায়। এর মধ্যে অনেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
২২ জুলাই বিকালে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন সরেজমিন যাত্রাবাড়ী পরিদর্শনে যান। তাদের সঙ্গে ছিলেন পুলিশের বিশেষ শাখার তৎকালীন প্রধান মনিরুল ইসলাম, র্যাব মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ এবং ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তৎকালীন আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, এই সহিংসতায় যারা অংশ নিয়েছে, তাদের প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি করানো হবে।
দেশজুড়ে সরকারি বাহিনীগুলোর হাতে হাজার হাজার মানুষ আটক হন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, কুমিল্লাসহ প্রায় সব জেলায় চলে মামলা ও গ্রেপ্তার। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ ও স্থানীয় নেতাকর্মীরাও গুম ও গ্রেপ্তারের শিকার হন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

