ফিরে দেখা জুলাই বিপ্লব

সারজিস-হাসনাতকে তুলে নেওয়ায় আন্দোলনে গতি

সারজিস-হাসনাতকে তুলে নেওয়ায় আন্দোলনে গতি
ফাইল ছবি

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং হাসনাত আবদুল্লাহকে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে দ্বিতীয় দফায় গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকা তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই পদক্ষেপ কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা আনে।

ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. জুনায়েদ আলম সরকার তখন জানান, গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে এই পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাঁচ সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন। ২৭ জুলাই বিকালে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ডিবি কার্যালয়ে যায় তাদের খোঁজ নিতে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তারা ডিবিপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।

শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শিক্ষকরা কঠোর অবস্থান নেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের প্রতি হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানায়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে গভীর রাতে হাতিরঝিলের বাসা থেকে আটক করা হয় ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে।

শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ছাত্র সংগঠনগুলো দেশব্যাপী প্রতিবাদ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। জুলাইয়ের শেষভাগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন ও সহিংসতা তীব্র হয়ে ওঠে। ২৭ জুলাই রাত পর্যন্ত কোটা আন্দোলনের সময় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সারা দেশে ৭৩৬টির বেশি মামলা হয়। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই মামলা হয় ২০৭টি। ঢাকাতে গ্রেপ্তার হয় ২ হাজার ৫৩৬ জন। এর বাইরে র‌্যাবের অভিযানে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন ৭১ জন। সব মিলিয়ে সারা দেশে গ্রেপ্তার ৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ঢাকাসহ সারা দেশে যেসব মামলা হয় তার বেশিরভাগ মামলার বাদী পুলিশ।

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম, তিন দাবি

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫ সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে ডিবিতে রেখে আন্দোলন বন্ধে চাপ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কোটা সংস্কার করে আদালতের রায়ের পর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তা প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে জানান, পুলিশের ধরপাকড়সহ নানা কারণে সব সমন্বয়কের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পারছেন না। যে কারণে সমন্বিতভাবে তারা কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারছেন না।

তারপরও নতুন তিন দাবি জানিয়ে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়।দাবির মধ্যে ছিল— নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তি, আন্দোলনের নামে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং শিক্ষার্থী গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মন্ত্রী থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত দায়ী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকার দাবি করছে আন্দোলনের মূল দাবি মানা হয়েছে। কিন্তু আমরা দাবি করেছিলাম একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সেটি হয়নি। তাই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করছি। অন্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছিলেন, এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাত-সহিংসতায় ২৬৬ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়া ছাত্রদের নামে করা মামলাগুলোকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়। পরদিন ২৮ জুলাই থেকে সারা দেশে অনলাইন ও অফলাইনে প্রচারণা চালানো, বিভিন্ন দূতাবাসে দলিল পেশ করা এবং দেওয়াল লিখন কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। ২৯ জুলাই থেকে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা, উপজেলা ও নগরকেন্দ্রিক ‘হেলথ ফোর্স’ গঠন করে আহত-নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি এবং আহত-নিহত ছাত্র-নাগরিক ও তাদের পরিবারকে মানসিক এবং আর্থিকভাবে সহযোগিতা এবং ‘লিগ্যাল ফোর্স’ গঠন করে শিক্ষার্থীদের নামে মামলার ডকুমেন্টেশন এবং যাদের আইনি সাহায্যের প্রয়োজন তাদের সেই সাহায্যের ব্যবস্থা করারও ঘোষণা দেওয়া হয়।

সরকার ও বিরোধীদের বিবৃতি

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিষোদগার করে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যেই এ সহিংসতা চালানো হয়েছে।’ অপরদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের দমননীতির নিন্দা করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারকে চিঠি লিখে বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি এবং শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের মত ড. ইউনূসের

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংকট উত্তরণের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট দিয়ে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য স্বল্প সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পক্ষে মত দেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে একটি প্রকৃত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। জনগণের নির্দেশনায় গণতন্ত্রের সমস্যার প্রতিকার সম্ভব। কারণ, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, সরকারে থাকা কিছু মানুষের জন্য নয়।’ এছাড়া বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড বন্ধে তিনি বিদেশিদের প্রতি সহায়তার আহ্বান জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন