কোনো আলোচনা ছাড়াই তড়িগড়ি করে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির মুখে বুধবার বিলটি সংসদে উত্থাপন করার পরপরই সেটা পাস করা হয়। বিলটি স্থায়ী কমিটিতে না পাঠানো, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া, দ্রুততার সঙ্গে পাস করার কঠোর সমালোচনা করে বিরোধী দল।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে, যৌক্তিক হলে গ্রহণ করা হবে। বিদ্যমান পৃথক চারটি আইনকে একীভূত করে একটি ‘কর্তৃপক্ষ’ গঠন করতে এ বিলটি পাস হয়েছে।
বুধবার বিকেলে সম্পূরক কার্যসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল সংসদে তোলেন সংসদ কাজে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে তা সংসদীয় কমিটিতে না পাটিয়ে সরাসরি পাসের প্রস্তাব করেন। সাধারণত বিল উত্থাপনের পর সেটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপন করতে গেলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই আইনের মাধ্যমে ছয়টি পূর্ববর্তী আইনকে রহিত করা হচ্ছে। একই সাথে দুইটা প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করা হচ্ছে। স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকে এটা দেয়া হয়েছে, আপনি তিন দিনের বিষয়টা কন্ডন করেছেন। কিন্তু ৯ জুলাই এই আইনটি মন্ত্রিসভায় পাশ হয়েছে। আজকে ১৫ই জুলাই, ছয়টা দিন চলে গেল। এর মধ্যে আমাদেরকে এই তিন দিনের যেই নোটিশটা দেওয়ার কথা ছিল, ডকুমেন্টগুলো দেওয়ার কথা ছিল, দেওয়া হলো না কেন তার কোন জাস্টিফিকেশন কিন্তু পেলাম না।
বিরোধী দলের এই সদস্য আরও বলেন, এটা কমিটিতে না দিয়ে সরাসরি পাশ করার এত তাড়াহুড়া কি জন্য তারও কিন্তু কোন জাস্টিফিকেশন আমরা দেখছি না। এখানে কোনো স্বার্থ জড়িত কি না, এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বিলটি স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণের বিষয়টি সপ্তম সংসদ থেকে শুরু হয়েছে। যে বিলটি আনা হয়েছে এটা কোন নতুন আইন নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে। যার ফলে ওভারল্যাপিং হচ্ছে ফাংশনে। ওয়ান উইন্ডোতে আমরা সার্ভিস পাচ্ছি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ গুলো একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। সেগুলো জাস্ট মার্জার করা হচ্ছে একটা কর্তৃপক্ষের মধ্যে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি সংসদে আরও আগে আনতে পারলে তাঁরা খুশি হতেন। কিন্তু আজ অধিবেশন শেষ হবে। এই বিলটার মধ্যে যদি জটিল কোন বিষয় থাকলে তিনি নিজেই এটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতেন। তিনি আইন পাসে বিরোধী দলের সহযোগিতা চান।
তখন আবারো ফ্লোর নিয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, আইন প্রণেতাদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে তাদের মৌলিক অধিকার এটাকে যাচাই বাচাই করা। সেখান থেকে বঞ্চিত করা মানে মৌলিক অধিকার এখানে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘কোন সময় না দিয়ে এভাবে তাড়াহুড়া করে আপনারা যদি বিল পাশ করার অনুমতি দেন তাহলে আমি মনে করি আমাদের যে মৌলিক অধিকার আইন প্রণেতা হিসেবে সেটা আমাদের ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং এটা বারবার হচ্ছে। তবে তাঁর আপত্তি নাকচ হয়। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। উত্থাপনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য উত্থাপন করেন।
তখন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, কয়েকটি ধারা উল্লেখ করে এসব ধারায় তাদের সংশোধনী আছে বলে সংসদকে জানান এবং সেটা কিভাবে দেবেন এই প্রশ্ন তোলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাননীয় সদস্য যে সমস্ত ধারাগুলোতে সংশোধনের কথা বলছেন। এখন বিধি মোতাবেক যেহেতু আপনি সবকিছু কন্ডন করেছেন তারটাও কন্ডন করে মৌখিকভাবে উত্থাপনের অনুমতি দিতে পারেন। আমরা নোট করব এবং সেই প্রেক্ষিতে যদি কোন সংশোধনী গ্রহণ করার থাকে তাহলে পরে আমরা সেটা গ্রহণ করব যদি সেটা যুক্তিযুক্ত হয়।
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এই অধিবেশনের শেষ দিন আমরা চাই যে আমাদের এই দিনটা এই অধিবেশনের যেন গ্লোরিফাই হয়ে থাকুক। এখানে প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু আইন খুব তড়িঘড়ি করে পাশ করতে হয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতার কারণে। সেই সময় আমরা বলেছিলাম যে ভবিষ্যতে যেন সব কিছু আমাদের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা অনুযায়ী আসে। এখানে শুধু অধিকারের প্রশ্ন। এটা দায়িত্বেরও ব্যাপার। আমরা অধিকার না হয়ে স্যাক্রিফাইস করলাম কিন্তু দায়িত্বে আমাদের অবহেলা হয়ে গেল।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, একটা বিষয়কে তাড়াহুড়া করে একোমোডেট করতে গিয়ে অনেক অধিকার এবং দায়িত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং এইটা এই সংসদের জন্য ভালো কোন প্রেসিডেন্স হবে না।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ‘রাইটলি পয়েন্ট আউট’ করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে সদস্যরা যে সমস্ত ধারার মধ্যে সংশোধনী আনতে চান, সেটা নিয়ে এলে যৌক্তিক হলে তা গ্রহণ করা হবে। আগামী অধিবেশনেও সেটা হতে পারে।
তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মাননীয় মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মহান জাতীয় সংসদে আমরা প্রত্যাশা করছি সেই প্রতিশ্রুতি আপনি রক্ষা করবেন যৌক্তিকভাবে। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

