জুলাই বিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের খুনিদের মধ্যে কোন অপরাধবোধ কাজ করছে না। তারা এখনো ক্ষমাও চাচ্ছে না। তাদের সাথে কোনো আপস বা তাদের ক্ষমার কোন প্রশ্নই ওঠে না। জুলাই গণহত্যায় জড়িত অপরাধীদের, খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। যতদিন শহীদদের সাহসী মায়েরা আছে, সিভিল সোসাইটির শয়তানদের জুলাইকে ভোলানোর চেষ্টা সফল হবে না। খুনিদের প্রভাব বলয় ভেঙে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ রক্ষার জন্য, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং জুলাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রাণ দিব, কিন্তু জুলাই দেব না।
রোববার রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স (জেআরএ) ফাউন্ডেশন আয়োজিত 'সিম্পোজিয়াম অন অ্যাকাউন্টেবিলিটি, জাস্টিস অ্যান্ড হিলিং ইন পোস্ট জুলাই বাংলাদেশ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক উপদেষ্টারা এসব কথা বলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, জুলাইয়ের পক্ষে মিডিয়া বা সুশীলরা কথা বলবেন না। কারণ জুলাই ঘটিয়েছে জনগণ এবং জুলাইয়ের এক তারিখ থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া আবার জুলাইয়ের দখলে। কারণ তারাই এটা রক্ষা করবে। আমি কোনোদিন ভাবিনি আমাদের জীবদ্দশায় আওয়ামী লীগের বাইরে কোনো সরকার দেখে যেতে পারব। আওয়ামী লীগ দেশটাকে তাদের দখলে রেখেছিল, কিন্তু নতুন জেনারেশন তা মেনে নেয়নি। জুলাই আমাদের সার্বভৌমত্বকে ফিরে পাওয়ার ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ দিয়েছে।
ফারুকী আরো বলেন, শহীদ ফাহমিনের মা সেদিন বলছিলেন প্রয়োজন হলে আমার অবশিষ্ট এই দুইটা ছেলেকে আমি পাঠাব দেশের জন্য। এই মায়েরা এ দেশে যতদিন থাকবে ততদিন সিভিল সোসাইটি নামক শয়তান যে শয়তানি করছে জুলাইকে ভোলানোর এবং জুলাইকে সন্ত্রাসী-জঙ্গি যত রকমের মিথ্যাচার করছে কোন শয়তানি দিয়ে কাজ হবে না। কারণ এই সিভিল সোসাইটি জুলাই ঘটায় নাই। জুলাই ঘটাইছে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ। আমি মনে করি আমাদের বড় আশা হচ্ছে এই মায়েরা এবং এই মায়েদের ছেলেরা।
হাসিনা ‘ভিতুর ডিম’, দেশে ফিরলে ফাঁসির দড়ি ফেস করতে হবে : শফিকুল আলম
আওয়ামী লীগ ভারতভিত্তিক সংগঠন, বাংলাদেশে তাদের রাজনীতির সুযোগ নেই : তুষার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধের তদন্ত পুলিশের হাতে রাখা হাস্যকর: নাবিলা ইদ্রিস
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জান দেব, জুলাই দেব না : ব্যারিস্টার আরমান
ঢাকা ১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, আয়নাঘর থেকে এবং বের হওয়ার সময়ও আমি মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম, কিন্তু জুলাই যোদ্ধাদের ত্যাগের কারণে আমি আমার সন্তানদের কাছে ফিরতে পেরেছি। আমার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন জুলাই শহীদদের কাছে ঋণী। সাড়ে পাঁচ মাস পার হলেও সংসদে দাঁড়িয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। যারা শুধু ৫-১০ বছরের ক্ষমতা নিয়ে ভাবেন, তারা জুলাই বাস্তবায়নের আগ্রহ পাবেন না; যারা ৫০ বছরের স্বপ্ন দেখেন তারাই বুঝবেন এর গুরুত্ব।
তিনি আরো বলেন, জুলাই মিউজিয়াম হবে পরবর্তী প্রজন্মের পাঠশালা, যেখানে তারা ফ্যাসিবাদকে চিনতে শিখবে। ফ্যাসিবাদ কোনো দলের নাম নয়, এটি একটি আচরণের নাম। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আমাদের আবারও কোমর বাঁধতে হবে। হয় বাস্তবায়ন হবে, না হয় আমার জীবন চলে যাবে। হয় মাতৃভূমি, না হয় মৃত্যু। জুলাইয়ের দাবি থেকে একচুলও নড়ব না।
সাবেক প্রেস সচিব ও দ্যা ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, আওয়ামীলীগের খুনিদের রিকনসিলিয়েশন বা ক্ষমার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যারা অপরাধ স্বীকার করে না। যারা বাচ্চাদের চোখে গুলি করেছে, গুম করেছে, তাদের সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আমাদের একটি শক্তিশালী ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি করা উচিত যারা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে জুলাইয়ের খুনিদের এবং শেখ হাসিনাকে খুঁজে বের করবে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর তাদের আপডেট দেবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সে বলছে দেশে আসবে। সে আসবে না। সে ভিতুর ডিম। পালায় না বলছিল না? লেজ গুটিয়ে কে পালাইছিল? তার আশেপাশে অনেক খুনি। এরাই তাকে ক্ষমতায় রেখেছে। যখন জুলাই জাগ্রত হয়েছে। দেখলো যে জনতা আসছে, তখন লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। হাসিনার কথা কী বলব, রুচিতে আসে না। এসব কথা বাদ দেন, আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত একটি বড় জুলাই পরিবার তৈরি করায়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগ ভারতভিত্তিক একটি সংগঠন, যার হেডকোয়ার্টার ভারতে। এটি একটি ন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রশ্ন। তারা জুলাইকে এখনো ‘সন্ত্রাস’ বা ‘জঙ্গি উত্থান’ হিসেবে দেখে আমাদের ঝুলাতে চায়। খুনি শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে ফিরে আসবেন বলে যে আলোচনা চলছে, আমি বলব শেখ হাসিনার ‘শ’ বাংলাদেশে আসবে না। তার এ সাহস নেই। এরপরও যদি আসে তিনি আসুক, আমরা রেডি। কিন্তু তিনি যদি আসেন, তাকে ফাঁসির দড়ি ফেস করতে হবে। আওয়ামী লীগের বাংলাদেশে রাজনীতির আর কোনো সুযোগ নেই। একুশ শতকের দুনিয়ার সবচেয়ে তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের বিদায় হয়েছে। যতদিন আমরা জীবিত আছি, আওয়ামী লীগের মতো খুনি সংগঠনের বাংলাদেশে কোনো জায়গা হবে না।
জাতীয় গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, আয়নাঘরের ভিক্টিমদের রেজিলিয়েন্স আমাকে অবাক করেছে। র্যাবের ওখানে সাড়ে তিন বছর চোখ-হাত বাঁধা অবস্থায় কাটানো একটা ছেলে এখন মানবাধিকার কর্মী হতে চায়; জুলাই তাকে এই স্বপ্ন দিয়েছে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও এখন রিয়েলাইজেশন আসছে যে তারা কতদিন রাজনৈতিক দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তবে বর্তমান সরকার আসার ৩০ দিনের মাথায় মানবাধিকার ও গুম সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। এখন নতুন আইনের যে ড্রাফট হচ্ছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন কোনো সংস্থার হাতে না দিয়ে উল্টো পুলিশের হাতেই রাখার চেষ্টা চলছে। যেমন ডিজিএফআইয়ের অপরাধের তদন্ত করবেন একজন এসআই, যা হাস্যকর। সরকারের যুক্তি হলো এগুলো আইসিটিতে বিচার হবে, কিন্তু তদন্ত ঠিক না হলে 'সিস্টেম্যাটিক অফেন্স' প্রমাণ করা অসম্ভব। আমি চাই না বিচার কারো দয়া-দক্ষিণার ওপর নির্ভর করুক। হাসিনার ক্রাইম ছিল অন্য লেভেলের, কিন্তু বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়াতে আওয়ামী লীগের অপরাধকে লঘু করে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা একটি রেপুটেশনাল রিস্ক।
আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহীদুল আলম বলেন, শেখ হাসিনা চলে গেলেও তার প্রভাব বলয় যেমন বসুন্ধরা বা সিআরআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বহাল তবিয়তে আছে। তারা এখনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে অ্যাডভাইজ দিচ্ছে, যা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার। রাজনৈতিক সংস্কৃতি না বদলালে শুধু গদি পরিবর্তন করে লাভ নেই। আমাদের আমলারা এখনো তাদের রাজনীতি ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
হাসিনা প্রচণ্ড নিপীড়ন চালিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু অনেক মানুষের নীরবতার কারণেই তিনি এটা করতে পেরেছেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে দলীয় আনুগত্যই ছিল একমাত্র যোগ্যতা। আমাদের মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে যাতে আমরা স্বাধীনভাবে সত্য বলতে পারি। শহীদরা যে রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ, ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ চেয়েছেন, সেই বিচার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে জেআরএ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সালেহ আহমেদের সভাপতিত্বে আর বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ, জুলাই শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের মা কাজী লুলুল মাখমিন, জুলাই শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী প্রমুখ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

