ফ্যাসিজমই আ.লীগের আদর্শ ও মূলনীতি: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার

ফ্যাসিজমই আ.লীগের আদর্শ ও মূলনীতি: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

ফ্যাসিজমই আওয়ামী লীগের আদর্শ এবং ফ্যাসিজমই তাদের মূলনীতি বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে ততবারই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। কারণ ফ্যাসিজমই হচ্ছে তাদের আদর্শ ও মূলনীতি। তারা সংবাদপত্রে স্বাধীনতা হরণ করেছে। পঁচাত্তর সালে তারা সব সংবাদপত্র বন্ধ করে মাত্র চারটি সংবাদপত্র চালু রেখেছিল, যার তিনটি ছিল শেখ পরিবারের আত্মীয় স্বজনের নিয়ন্ত্রণে।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে সংবাদপত্রের কালো দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) এর উদ্যোগে ‘আওয়ামী শাসনে গণমাধ্যম ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ১৭ বছর কি করেছে? সংবাদপত্রের উপরে কিভাবে জুলুম নির্যাতন চালিয়েছে? মাহমুদুর রহমানসহ অনেকের উপরে অত্যাচার নিপীড়ন দেখেছি। আমরা দেখেছি অনেক সাংবাদিকদের উপরে অত্যাচার নিপীড়ন হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নির্যাতন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেব এবং তার পরিবারের উপরে কিভাবে অত্যাচার নিপীড়ন হয়েছে আমরা দেখেছি। কিভাবে আমাদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে জনগণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে দেখেছি। এগুলো সবই ফ্যাসিজমের অংশ। এটাই (ফ্যাসিজম) তাদের আদর্শ। ফ্যাসিজমই তাদের মূলনীতি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর গণমাধ্যমের ওপর কোনো রকম হস্তক্ষেপ করেনি এবং করবে না। কোনো খবর প্রচার করা বা বন্ধ করার নীতি বা মানসিকতা আমাদের নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সংবাদপত্র সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে।

গণমাধ্যমের সাথে সরকারের সুসম্পর্ক আছে এবং সরকার এটি বজায় রাখতে চান বলে সাংবাদিকদের জানান ইয়াসের খান। তিনি বলেন, আমরা একটি ‘টিম’ হিসেবে কাজ করতে চাই, কারণ টিম ওয়ার্ক ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শত বছরের জঞ্জাল থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করতে হলে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্রিত হতে হবে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা যা পেয়েছি, তা ধরে রাখতে হবে। ফ্যাসিস্টরা যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট কলাম লেখক এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম।

সভাপতির বক্তব্যে বিএজের সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসীদের হাতে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত হামলা, মামলা ও হুমকিসহ নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। যাতে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করা যায়। সেজন্য কাজ করে যাবে বিএজে।

বিএজে সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০২১ সালে সাংবাদিকদের অধিকার, মানবাধিকার নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরী ও গবেষণার জন্য আমাদের এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। মাঝখানে ব্যক্তিগত ও পেশাগত ব্যস্ততার কারণে কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা এলেও আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য থেকে কখনো বিচ্যুত হইনি। এটি কোনো প্রচলিত ট্রেড ইউনিয়ন নয়; বরং সাংবাদিকদের ওপর হওয়া নির্যাতন-নিপীড়নের গবেষণামূলক মাসিক রিপোর্ট প্রকাশ এবং তাঁদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের তারেক ফজল বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা হলো বাংলাদেশকে একটি ‘খাঁটি রিপাবলিক’ বা প্রজাতন্ত্রে পরিণত করা। রিপাবলিক মানে হলো এমন একটি রাষ্ট্র যার মালিকানা জনগণের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। ফ্রান্সে যখন রাজতন্ত্রের বদলে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলো, সেটিই ছিল রিপাবলিকের আধুনিক যাত্রা। বাংলাদেশে যখন কেউ বলতে শুরু করল ‘দেশটা আমার বাবার’, তখন জনগণ সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্রটি কোনো ব্যক্তির নয়, বরং জনগণের।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক কামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৬ই জুন বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল, যা আজও কালো দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিগত ১৬ বছরেও আমরা সেই একই বাকশালী কায়দায় সংবাদমাধ্যমকে একতরফা হতে দেখেছি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু পরিবর্তন হলেও এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার লোক বসে আছে। আওয়ামী লীগ মূলত একটি রাজনৈতিক দলের চেয়েও একটি ‘কাল্ট’ বা গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। আমি বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ রাখব যেন তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন এবং এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে সাংবাদিকরা আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের কথা নির্ভয়ে লিখতে পারেন। সংবাদশিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

আমার দেশ-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী বলেন, বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এই সময়ে সাংবাদিকতা এমন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল যে, সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতেও লজ্জা লাগত। সামাজিক অনুষ্ঠানে আমি নিজের পরিচয় দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার, সাংবাদিক নেতা এবং মিডিয়া মালিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা সাংবাদিকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চাই এবং পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে চাই।

বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল কথা ছিল গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সে দেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা থাকতে পারে না। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অতীতে মালিক এবং সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য ছিল। এমনকি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় হামিদুল চৌধুরী সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেননি। কিন্তু এখন মালিকপক্ষ এবং সাংবাদিকদের মধ্যে সেই পেশাদারিত্বের অভাব প্রকট। প্রেস ক্লাব বা সাংবাদিক ইউনিয়ন সবখানেই দলাদলি। সাংবাদিকতায় বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রফেশনালিজম না ফিরলে গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্র কোনোটিই ঠিক হবে না।

ডিআরইউ’র সাবেক সভাপতি ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব ইলিয়াস হোসেন বলেন, বিগত শাসনামলে অলিগার্ক, লুটেরা এবং দলীয় আস্থাভাজনদের টেলিভিশন ও পত্রিকার লাইসেন্স ঢালাওভাবে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মিডিয়ায় সংখ্যার আধিক্য ঘটলেও গুণের দিক থেকে তা অত্যন্ত নিম্নমানের বা অপুষ্টির শিকার হয়েছে। এমনকি প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মুসার মতো ব্যক্তিকেও লাইসেন্সের জন্য শেখ হাসিনার দরবারে ঘুরতে হয়েছে, কিন্তু তিনি পাননি। অথচ অযোগ্য ব্যক্তিরা লাইসেন্স পেয়েছে। আমরা যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাই এবং দেশকে ভালোবাসছি, তবে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মেধা ও জ্ঞানের চর্চা করতে হবে। সৃজনশীল এই পেশার মর্যাদা রক্ষায় যোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই।

ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ১৬ই জুন আমাদের জন্য কালো দিবস। সেই বাকশালী শাসনামলে যখন গণমাধ্যম বন্ধ করা হয়েছিল -সেটি যেমন কালো দিবস, তেমনি আজও যখন সাংবাদিকরা বেতন পায় না, সেটাও তাদের জন্য কালো দিবস। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যখন মামলা হয়, সেটাও কালো দিবস। আমাদের এই কষ্টকর সময়গুলো এখনও শেষ হয়নি। এখন আমরা ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’র কথা বলছি। আমরা যারা এই আন্দোলনের সময় মাঠে ছিলাম, আমাদের চেতনা ছিল ফ্যাসিস্টের পতন ঘটিয়ে একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা। আমাদের দাবি ছিল আওয়ামী শাসনামলে যেসব গণমাধ্যম বন্ধ হয়েছে, সেগুলো চালু করা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কিছু চালু হলেও সবগুলো এখনো হয়নি।

তিনি আরো বলেন, আন্দোলনের চেতনা ছিল নয়াদিগন্তসহ যেসব পত্রিকা দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপন পায়নি এবং বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। বিগত সময়ে নয়াদিগন্ত, ইনকিলাব বা সংগ্রাম-কে বিজ্ঞাপন দিলে কোম্পানিগুলোকে শাসানো হতো। অথচ এখনো যখন আমরা বৈষম্যের কথা বলি, তখন সমতার দোহাই দিয়ে সেই ফ্যাসিস্টদেরই লালন-পালন করা হচ্ছে (যারা বিগত সরকারের সময় সুবিধাভোগী ছিল)। যারা বেতন বকেয়া নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে, তাদের দিকে নজর দিন। এই বঞ্চনা দূর না হলে ‘কালো দিবস’ চলতেই থাকবে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, সাংবাদিকতা বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বর্তমানে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে প্রচুর পত্রিকা রয়েছে -প্রায় ১২৫৭টির মতো। এত পত্রিকার ভিড়ে প্রকৃত সাংবাদিকের মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যত্রতত্র সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া এখন একটি নেতিবাচক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নিয়েও জালিয়াতি চলে। বলা হয় দুই লক্ষ চলে কিন্তু আসলে ১ লক্ষও চলে না। বছরের পর বছর এই মিথ্যাচার চলছে রেট বাড়ানোর জন্য। বড় প্রশ্ন হলো -এখন কি সাংবাদিকের স্বাধীনতা আছে, নাকি মালিকের স্বাধীনতা? একদিনে তিনজন সম্পাদক পরিবর্তনের মতো ঘটনাও ঘটছে। সাংবাদিকতায় প্রবেশের কোনো মানদণ্ড নেই, যা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বিএজের সাধারণ সম্পাদক আহমদ মতিউর রহমান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ফয়সালের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় অংশ নেন ডিইউজে’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ বাকের হোসাইন, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান ও সরদার ফরিদ আহমদ, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল, ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, সাব এডিটরস কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, সিভিল রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের উপপরিচালক এবিএম রফিকুল ইসলাম, ডিইউজে’র সাবেক সহসভাপতি সৈয়দ আসফার, সিনিয়র সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল প্রমুখ।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...