শিশু মো. সানি, বয়স ৯ মাস। শরীরজুড়ে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি। চলছে স্যালাইন। কখনো কখনো শ্বাসকষ্টের জন্য দিতে হচ্ছে অক্সিজেন। এমনকি ক্যানুলা করার জন্য শিশুর মাথার অর্ধেক চুল ফেলে দিতে হয়েছে। সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। শিশুটির মা মারুফা আক্তার নানাভাবে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কিন্তু কোনোভাবেই কান্না থামছে না। পাশেই দাঁড়ানো বাবা শিশুটির কান্না দেখে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। মাঝেমধ্যে তিনিও কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন, তবু থামানো যাচ্ছে না শিশুটিকে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (শিশু হাসপাতাল) বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
শিশুটির বাবা ইলিয়াস হোসেন আমার দেশকে জানান, তাদের বাড়ি শরীয়তপুরে। এক মাস আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে শিশুটিকে প্রথমে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে শিশু হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করা হয়। তিনি বলেন, ১৫ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর হামের সংক্রমণ দেখা দেয়। এরপর থেকে আমরা এক অন্যরকম যুদ্ধের মধ্যে আছি। এত ছোট বাচ্চা, আবার গুরুতর অসুস্থ। বুকের দুধ পর্যন্ত খাচ্ছে না। যখন কাঁদে, তখন বাবা হিসেবে নিজেকে খুব অসহায় লাগে।
শুধু এ একটি ঘটনা নয়, শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তত ১০ শিশুর অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের সন্তানরা প্রথমে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিল, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্য রোগীর সংস্পর্শে এসে হামে আক্রান্ত হয়েছে। এতে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা। এছাড়া আরো অনেক শিশু অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে এসে হামের সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে, ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৬৬ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ১৭ শিশু। জানুয়ারিতে ভর্তি হয়েছিল মাত্র দুই শিশু, ফেব্রুয়ারিতে ছয়, মার্চে ১৩০ শিশু এবং এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৮-এ। অর্থাৎ মার্চের তুলনায় এপ্রিলে রোগী ভর্তির হার বেড়েছে ১৫২ দশমিক ৩১ শতাংশ।
আক্রান্ত শিশুদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছয় থেকে ৯ মাস বয়সি শিশুÑসংখ্যা ১৫৮, যা মোট আক্রান্তের ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। ৯ মাস থেকে দুই বছর বয়সি শিশু ১২৩, ছয় মাসের কম বয়সি শিশু ১০৭, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশু ৫৩ এবং পাঁচ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যা ২৬। বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৮১ শিশু।
সরেজমিন দেখা যায়, শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্তদের জন্য আলাদা ‘বিশেষায়িত হাম’ ইউনিট চালু করা হয়েছে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রসহ (আইসিইউ) মোট ৮০টি শয্যার একটিও খালি নেই। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অধিকাংশ শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে। কারো শরীরে স্যালাইন চলছে, কারো নাকে নল, আবার কেউ অক্সিজেন সহায়তায় রয়েছে।
প্রচণ্ড জ্বর ও ব্যথায় শিশুদের অবিরাম কান্না যেন থামছেই না। পাশে বসে থাকা মা-বাবার চোখে অশ্রু, সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে কিংবা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। তবে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে আইসিইউ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গতকাল দুপুরে আইসিইউয়ের সামনে অপেক্ষা করেও অন্তত পাঁচজন রোগীর স্বজনকে শয্যা না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে। তারা জানান, বাধ্য হয়ে শিশুদের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভর্তি করাতে হয়েছে।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম বলেন, তার সাত মাসের শিশুকে ১৫ দিন আগে ভর্তি করা হয়। তিনদিন পর অবস্থার অবনতি হয়। মনে হচ্ছিল বাচ্চার প্রাণ বের হয়ে যাবে। চিকিৎসক আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু সিট খালি ছিল না। অনেক তদবিরের পর তিনদিন পর আইসিইউতে জায়গা পাই। এখনো সেখানে চিকিৎসা চলছে, কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
মাদারীপুর থেকে আসা আয়েশা বেগম জানান, তার আট মাসের শিশু আবু রায়হান প্রথমে ঠান্ডা-জ্বরে আক্রান্ত হয়, পরে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে শিশু হাসপাতালে আনা হয়। এখানে ১৫ দিন পর শরীরে লাল র্যাশ ওঠে। চিকিৎসকরা জানান, এটা হাম। এরপর থেকেই হামের চিকিৎসা চলছে। এখন কিছুটা ভালো হলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। তার অভিযোগ, অন্য হামের রোগীর সংস্পর্শ থেকেই তার শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা জানান, হাম যেহেতু ছোঁয়াচে রোগ, তাই শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এক রোগী থেকে অন্য রোগীর শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ার কারণে পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া সময়মতো টিকা না নেওয়া, অপুষ্টির ঘাটতির কারণেই হামের সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে বলেও জানান তারা।
অন্যদিকে যেসব শিশু হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা জন্মগত হৃদরোগে ভুগছে, তাদেরই বেশি মৃত্যু হচ্ছে বলেও জানান চিকিৎসকরা।
এ বিষয়ে শিশু হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আজহারুল ইসলাম বলেন, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা বাড়ানো হয়েছে এবং আইসিইউ সুবিধাও রাখা হয়েছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী আসায় চাপ বেড়েছে, ফলে সবাইকে শয্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবুও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
এদিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ‘সন্দেহজনক’ হামে আক্রান্ত হয়ে আরো চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিত হামে কারো মৃত্যু হয়নি। একই সময়ে ‘সন্দেহজনক’ হামে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৪ জন এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৭২ জনের। তাতে সব মিলিয়ে হামের নতুন রোগী এক হাজার ৯৬ জন। এ নিয়ে সরকারি হিসাবে গত ১৫ মার্চ থেকে হাম সন্দেহে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৫। আর এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ শিশুর। ফলে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৮৪। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

