মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশ্ব সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

আসাদুল্লাহ মাহমুদ

মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশ্ব সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে খনিজ তেলের বিশাল মজুত এই অঞ্চলকে প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করলেও বিপুল আয়ের উৎস এই খনিজ সম্পদই এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও বর্তমান সংকটের মূল কারণ। বিশ্বের মোট তেলভান্ডারের ৫২ শতাংশ তেলই মধ্যপ্রাচ্যের অধীনে। বিশ্ব সূচকের মানদণ্ডের সমীক্ষায় ইরান এককভাবে বিশ্ব তেল মজুতের ১১ দশমিক ৮২ শতাংশের দাবিদার। ইরানের নিজস্ব তেলসহ প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকরণ প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের প্রধান রাস্তা বলে বিবেচিত।

ভেনেজুয়েলার তেল সাপ্লাইয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের এই রাস্তারও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আমেরিকার সামরিক অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ চলমান থাকার ফলে এবং ইরানের আইআরজিসি কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণার জেরে বিশ্ববাজারে সব ধরনের তেল ও তরলীকরণ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরান কর্তৃক পরিচালিত ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’ কার্যত অচল করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রায় সব মার্কিন ঘাঁটি। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইল যদি হরমুজ প্রণালি এবং খার্গ দ্বীপ দখল করে ইরানের তেল সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে একদিকে যেমন ইরানে তার মনোনীত পুতুল সরকার বসাতে চাইবে, অপরদিকে চীন-রাশিয়ার প্রকৃত এনার্জি সাপ্লাইয়ার হিসেবে চিহ্নিত ইরানের তেল সরবরাহ কাজে বাধাগ্রস্ত করে চীন-রাশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরবে।

বিজ্ঞাপন
বিপরীতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন ‘প্রক্সি যোদ্ধা’, যেমন ইয়েমেনের হুথি বন্ধ করে দিতে পারে লোহিত সাগরের ‘বাব-আল মান্দেব প্রণালি’, লেবাননের হিজবুল্লাহ বন্ধ করে দিতে পারে ইসরাইলের উপকূলীয় কারিশ গ্যাস ক্ষেত্র এবং হুথি-হামাসের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে মিসর-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববাজারে ১০ শতাংশ তেল সরবরাহের অন্যতম রাস্তা ‘সুয়েজ খাল’।

চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে এরই মধ্যে বিশ্ব ‘সাপ্লাই চেইন’ ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের মোট এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সংঘাতের কারণে প্রতি ব্যারেলের দাম প্রায় ২০০ ডলারে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ আমদানি-রপ্তানির সব খাতে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ট্যাংকার টার্মিনাল এবং পাইপ লাইনে হামলার কারণে জ্বালানি পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটেছে, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, জীবন বাঁচানোর পণ্যসহ জরুরি ওষুধ সরবরাহ বন্ধের উপক্রম হয়েছে এবং খাদ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে পৃথিবীজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার সমূহ আশঙ্কা বাস্তবে প্রত্যক্ষ করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদি বিশ্ব নেতারা এই সংঘাতের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সর্বাত্মক একটি সংঘাতের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবীবাসী।

‘পৃথিবীজুড়ে তেলের ভান্ডার নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়, তাহলে পরবর্তী টার্গেট মিসর, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড কিংবা তুরস্ক, যা ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যবাদ পতনের কারণ হয়ে যেতে পারে, অথবা নতুন সাম্রাজ্যবাদের জন্ম দিতে পারে।’ উল্লেখ্য, লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতার কারণে গত শতকের তিরিশের দশকে জাপান-ইতালি-জার্মানির আগ্রাসী তৎপরতা বেড়ে যায়, ফলে হিটলার ও অন্যান্য সহযোগী স্বৈরশাসক মিলে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে। ১৯৪৫ সালে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই জাতিসংঘ (ইউএন) যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে, তা বর্তমানে মূলত কথাসর্বস্ব সভাসদদের মিলনায়তনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ১৯৪৯ সালে ৪ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসিতে স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলস্বরূপ জন্ম নেওয়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক জোট ন্যাটো (North Atlantic Treaty Organization) গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন ও আধিপত্যের বলয় থেকে পশ্চিম ইউরোপের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সদস্য দেশগুলোর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা রক্ষা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। ফলাফল হয়েছে বিপরীত। যৌথ প্রতিরক্ষার এই সামরিক জোটের ৩০ সদস্য নিজেরাই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হয়েছে বহুবার।

সুয়েজ খাল নিয়ে ১৯৫৬ সালে ইউকে, ফ্রান্স ও ইসরাইল দখল করলেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইউকে পিছু হটে। ১৯৫৮ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে মাছ ধরার বিবাদ নিয়ে আইসল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে কড যুদ্ধ আইসল্যান্ডের বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়। ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে তুরস্কের আগ্রাসনের জেরে গ্রিস ন্যাটো থেকে বের হয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে অতিরিক্ত মাছ ধরা রোধে কানাডা আর স্পেনের মধ্যে টারবোট যুদ্ধ ছিল রক্তপাতবিহীন সামুদ্রিক সংঘাত। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র গণবিধ্বংসী অস্ত্রমজুতের অভিযোগ তুলে ২০০৩ সালে পশ্চিমা বাহিনীর নেতৃত্বাধীন ইরাকে যে সামরিক অভিযান চালায়, তার অন্তরালে ন্যাটো জোট ইরাকের তেলভান্ডারকে মূল লক্ষ্যে পরিণত করেছিল।

২০১১ সালে ন্যাটো কর্তৃক লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি ছিল আপাতদৃষ্টিতে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে কৌশলগত কৃত্রিম গণঅভ্যুত্থান আর অন্তরালে ছিল লিবিয়ার খনিজ তেল, যখন বিশ্ববাজারে গাদ্দাফির নেতৃত্বে লিবিয়া সবচেয়ে কম খরচে দৈনিক ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে আফ্রিকার প্রধান তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। কখনো মানবতাবিরোধী অপরাধ, কখনো জঙ্গিবাদ, আবার কখনো গণতন্ত্র রক্ষার দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দেশে দেশে এই সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের পেছনে ন্যাটোর ভূমিকা কোনোভাবেই অনস্বীকার্য। ১৯৫৬ সালে ডোমিনিকান রিপাবলিক, ১৯৮৩ সালে গ্রেনাডা, ১৯৮৯ সালে পানামার সরকার পরিবর্তন করতে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’, ২০০১ সালে আফগানিস্তান, ২০০৩ সালে ইরাক, ২০১১ সালে লিবিয়া, ২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলা এবং চলমান সময়ে ইরানের সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা আধিপত্যবাদেরই নামান্তর।

ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্প ন্যাটোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন। ডেনমার্ক আপাতভাবে সতর্ক করে বলেছে, ‘জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে সবকিছু থেমে যাবে’, যার মধ্যে ন্যাটো জোট এবং গত ৮০ বছরের ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তা সম্পর্কও জড়িয়ে আছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয় এবং দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শুধু এর ৫৭ হাজার বাসিন্দারই রয়েছে।’ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধিভুক্ত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এটি কিংডম অব ডেনমার্কের অধীনে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। এখানে ২৫টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ দ্রব্য পাওয়া যায়, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রাফাইট, নিওবিয়াম, টাইটানিয়াম, লিথিয়াম, সোনা, তামা, নিকেলসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। গ্রিনল্যান্ডের এই প্রাকৃতিক সম্পদই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আগ্রহের কারণ। যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঠেকাতে গ্রিনল্যান্ড দখলে প্রয়োজনবোধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। ৩৯ ট্রিলিয়ন (৩৯ লাখ কোটি) ডলারের ঋণের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হওয়ার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডকে আক্রমণ করেই বসে, তাহলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ন্যাটো জোটের সদস্য।

গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার প্রস্তাব জোটের অন্য কোনো সদস্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখেনি। আপাতভাবে ন্যাটোর কার্যক্রম পক্ষপাতদুষ্ট মনে হচ্ছে। ন্যাটোর ভিত্তি হলো সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা। জোটের ৫নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা সব দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে। যদি এক সদস্য রাষ্ট্র অন্য সদস্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে, তাহলে ন্যাটো নিজেই সিদ্ধান্তহীনতায় পড়বে, কারণ জোট নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না। যদি তা সত্যিই হয় এবং নিজেরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তবে ভেঙে যেতে পারে ন্যাটো, জন্ম হতে পারে নতুন জোটের, আরো চরম অস্থিরতায় ডুবে যেতে পারে পুরো বিশ্ব।

লেখক : গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...