সিলেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশে ছন্দপতন ঘটায় বৃষ্টি। গত শুক্রবার রাত থেকে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলেও মাঝে কিছু সময় বন্ধ ছিল। গতকাল শনিবার সকাল থেকে আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়, যা চলে একনাগাড়ে। তবে বিকাল পৌনে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ উদ্বোধন করতে রিকাবী বাজার জেলা স্টেডিয়ামে পৌঁছান, তখন থেকে শেষ পর্যন্ত আর বৃষ্টি ছিল না।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই ঢাকা থেকে আকাশপথে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
বিমানবন্দর থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা লাল-সবুজ বাসে প্রথমেই তিনি বৃষ্টির মধ্যেই হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। পরে বেলা ১১টার দিকে সিলেট সার্কিট হাউস-সংলগ্ন সুরমা নদীর পাড়ের চাঁদনিঘাট জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের সুরমা নদী তীর উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় চার হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ মেগা প্রকল্পে নদীর দুই তীরে সৌন্দর্যবর্ধন ও বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের অগ্রগতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, এমরান আহমদ চৌধুরী এমপি, মোছা. তাহসিনা রুশদীর লুনা এমপি, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে তিনি নগর ভবনে সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
ঢাকা-সিলেট রেলপথ ডবল লাইন হবে
ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডবল লাইন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সিলেট নগর ভবনে সুধি সমাবেশে সিলেট-ঢাকা সড়কপথ ও রেলপথের উন্নয়নে সরকারের এ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেলের উন্নয়ন করতে হবে। এজন্য ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডবল লাইন করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আমি সিলেটে এসে বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ সিলেট থেকে বাইরোডে ঢাকা যেতে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়নের কথা বলেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণ কাজের জমি অধিগ্রহণে ১১ জায়গায় সমস্যা ছিল, এজন্য কাজও আটকে ছিল। এসব সমস্যা ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারব। কাজ শেষ হতে দেরি হবে, তবে শুরু হলে তো শেষও হবে। এতে মানুষের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব হবে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তা করা হবে। সিলেটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল দ্রুত চালু করে ১২০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালুর প্রতিশ্রুতি
বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এগুলো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। দরকার হলে প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দিয়ে চালু করতে চাই। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টেরও চেষ্টা করছি। সিলেট প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের হাব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, সিলেটে একটি আইটি পার্ক আছে, কিন্তু সচল নেই। আমরা এটি দ্রুত সচল করার চেষ্টা করছি। ভোকেশনাল সেন্টারগুলো আপডেট করারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সিলেটে আর জলাবদ্ধতা হবে না
নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় দেখলাম, বৃষ্টির পানি জমে গেছে। বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া সব নগরেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছি। তাতে আমরা বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে পারব। জলাবদ্ধতাও নিরসন হবে।
নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নদীতে প্লাস্টিকের স্তর জমে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় স্কুলগুলোয় উদ্যোগ নিয়ে শিশুদের পরিবেশের বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এই এক লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের দায়িত্ব হবে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবে। তবে আমরা জোর দেব, গ্রামের মানুষের ওপরে বেশি। তারা পরিবারের নারীদের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা গড়ে তুলবে।
তারেক রহমান বলেন, কোন খাবারটি খেলে ডায়াবেটিস হবে না, কোন খাবারটি খেলে কার্ডিও অ্যারেস্ট হবে না বা লাইফস্টাইল কী হলে তার হার্টের সমস্যা হবে না, কোন খাবারটি খেলে কিডনির রোগ হবে না এই বিষয়গুলো সম্পর্কে নারীদের সচেতন করবে তারা (নতুন নিয়োগ করা স্বাস্থ্যকর্মী)।
সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া সিলেট ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যার বিষয়টি উত্থাপন করে তা সমাধানে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে প্রতিশ্রুতি আমরা দেশের মানুষকে দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালু করেছি। শিশুদের খেলাধুলায় আকৃষ্ট করতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ চালু করেছি।
সুধী সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিলেট সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা সুনন্দা রায়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ সিলেটের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজসহ নানা শ্রেণি-পেশার ৪০০ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
সিটি করপোরেশনের সুধী সমাবেশ শেষে ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখতে বন্দরবাজার এলাকায় সড়কের দুই পাশে শত শত মানুষ ভিড় করেন। এ সময় হাত নেড়ে উপস্থিত জনতা ও নেতাকর্মীদের অভিবাদন জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাসিয়া নদী পুনঃখনন উদ্বোধন
সিলেট সদরের কান্দিগাঁও ইউনিয়নে ঐতিহাসিক বাসিয়া নদী পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৪৯ বছর পর এটি পুনঃখনন করা হচ্ছে।
সিলেটের চার উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত ৪০ কিমি দীর্ঘ বসিয়া নদী। এর ২৩ কিমি খনন করা হবে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে। ১৯৭৭ সালে প্রথমবার নদীটি খনন করা হয়েছিল। যার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
গতকাল দুপুর ২টার দিকে উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামের মানুষকে স্বাবলম্বী করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের একমাত্র জবাবদিহিতা দেশের মানুষের কাছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই একের পর এক নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সরকার।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে খনন করা নদীটি কালক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বছর পর এটি পুনরায় খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক সরাসরি এবং আরো ১৫ লাখ কৃষক পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

