প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান-বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, সবাইকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। সবার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা থাকতে পারে; কারও প্রতিভা খেলাধুলা, সংস্কৃতি, ছবি আঁকা কিংবা কারিগরি শিক্ষায় থাকতে পারে। তাই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেছে যে, যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করতে পারছে না কিংবা অকৃতকার্য হচ্ছে, তাদের কারিগরি শিক্ষা এবং প্রয়োজনে তৃতীয় ভাষা শেখানোর মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, এই দেশটা তো সবার, এখানে আমরা সমতার ভিত্তিতে সবার জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতে চাই। সবার কর্মজীবন এক হবে না। যার মধ্যে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড অ্যাকাডেমিক লিংকেজ: এআই-ফিকেশন টুওয়ার্ড বিজনেস ইনোভেশন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে এই সামিটের আয়োজন করে।
ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ।
বিদেশফেরত ও প্রবাসী মেধাবীদের প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বিদেশে থাকা দক্ষ ও মেধাবীদের দেশের বিনিয়োগ, গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ের কাজে যুক্ত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচারকে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁরা বিদেশে থেকেও কাজ করতে পারেন, আবার দেশেও ফিরতে পারেন। তাঁদের শিকড় যেন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং তাঁরা যেন দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রাখতে পারেন, সরকার সেই সুযোগ তৈরি করতে চায়।
দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলে সমস্যার দেশীয় সমাধান খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের অনেক সমস্যার সমাধানে এখনো বিদেশ থেকে পণ্য, পরামর্শক ও সহায়তা নিতে হয়। অথচ দেশের মেধাবী তরুণ ও দক্ষ জনশক্তির মধ্যেই এসব সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজে পাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। বিদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশিরা ভালো করছেন, উদ্যোক্তা হিসেবেও অনেকে সফল হচ্ছেন। অর্থাৎ মেধার অভাব বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং সেই মেধা বিকাশের উপযোগী প্ল্যাটফর্ম ও সুযোগ তৈরি করতে না পারাই মূল বাধা।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ এবং শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। শুধু পাঠদান নয়, গবেষণা ও প্রকল্পের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করতে হবে। এজন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যেখানে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত কোনো শিক্ষাবিদ বা গবেষক বাংলাদেশে এসে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
দেশের বিভিন্ন সমস্যার উদাহরণ দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, যানজট নিরসন, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পূর্বাفرাসের ভিত্তিতে চাষাবাদ এবং শিল্পের উৎপাদন ও দক্ষতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে স্থানীয়ভাবে সমাধান বের করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থেকে জেলা পর্যায়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব প্রযুক্তি শুধু আলোচনার বিষয় হয়ে থাকলে চলবে না; বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কীভাবে এগুলো ব্যবহার করা যায়, তা বুঝতে হবে। এআইয়ের কারণে কিছু কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। ডেটা অ্যানোটেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। সে অনুযায়ী শিক্ষাক্রমকে সময়োপযোগী ও ব্যবহারিক করতে পারলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে।
তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে স্টার্টআপ অর্থায়ন ও অনুদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্ভাবনী ধারণা এবং গবেষণায় অর্থায়ন করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে মূলধারার শিক্ষার বাইরে থাকা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও ভালো ব্যবসায়িক ধারণা থাকলে তাদের মূলধন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট ছোট উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।
তিনি আরও বলেন, বড় শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রকল্প ও ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও গুরুত্ব দিতে হবে। এক লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে তাঁদের প্রত্যেকে দুই থেকে পাঁচজন মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারবেন। এভাবে দ্রুত বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। বড় কোম্পানির পাশাপাশি এসএমই ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও উপযোগী নীতিসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের সফলতা বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার ও অন্যান্য অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত হবে। জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে অংশীজনদের মতামত, পরামর্শ ও সংলাপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর আগে সকালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এআই বিজনেস সামিটের উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
পরে তিনটি ভিন্ন সেশনে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ‘ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড নেভিগেটিং এআই রেভ্যুলেশন: অ্যাপ্লিকেশন, প্রোসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. জুলকারিন জাহাঙ্গীর, ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা রাইসুল কবীর, রেভোরার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শুভ রহমান এবং মার্কোপলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবীন।
এ ছাড়া ‘এআই ফর এভরিওয়ান: সলভিং রিয়েল প্রবলেমস উইথ লোকাল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক সেমিনারে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, লুজলি কাপলড টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ফিরোজ এম. জাহিদুর রহমান এবং ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসাইন খালেদ প্রমুখ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

