লঘুচাপ ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা, সাগরে সতর্কতা

লঘুচাপ ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা, সাগরে সতর্কতা
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

উত্তর আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপটি আজ রোববার বিকেল ৩টায় সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে উত্তর-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর আন্দামান সাগর এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি আরও পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হতে পারে। এ কারণে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় আগাম সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

সংস্থাটির পরিচালকের পক্ষে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক স্বাক্ষরিত সতর্কবার্তায় উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলা হয়েছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য কোনো সতর্কবার্তা নেই এবং কোনো সংকেতও দেখাতে হবে না বলে জানিয়েছেন সহকারী আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, লঘুচাপের প্রভাবে আজ সারা দেশে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও আগামী দুই দিন তা কমে ভ্যাপসা গরম বাড়তে পারে। আগামী বুধবার থেকে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি বাড়তে পারে। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে সারা দেশে বৃষ্টির প্রবণতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হতে পারে। রাজধানীতেও ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

বৃষ্টির কারণে রোববার সারা দেশে তাপমাত্রা কমেছে। এ দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রামে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন শনিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীতে ছিল ৩৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি। তাপমাত্রা কমায় কয়েক দিনের টানা ভ্যাপসা গরম থেকে স্বস্তি মিলেছে।

প্রতিবেশী ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লঘুচাপটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ ওডিশা-উত্তর অন্ধ্র উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। তবে এটি কতটা শক্তিশালী হবে বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়।

আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, গাণিতিক মডেল অনুযায়ী এখন পর্যন্ত এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ লঘুচাপটি বাংলাদেশের দিকে না গিয়ে ভারতের দক্ষিণ ওডিশা-উত্তর অন্ধ্র উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে বিষয়টি প্রাকৃতিক হওয়ায় সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আগামীকাল নাগাদ গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে ভারতের ওডিশা উপকূলের কাছাকাছি তৈরি হয়ে সেখানেই আঘাত হানতে পারে। বাংলাদেশে সরাসরি আঘাত না হানলেও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

নাজমুল হক আরও বলেন, লঘুচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে আবহাওয়া দপ্তর সতর্কবার্তা জারি করবে। এরপর দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, আন্তমন্ত্রণালয় এবং উপকূলীয় এলাকার জেলা প্রশাসকদের নিয়ে জরুরি সভা হবে। সেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক বা তার প্রতিনিধি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করবেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (বিডব্লিউওটি) জানিয়েছে, উত্তর ওডিশা ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে লঘুচাপটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এ সময় সমুদ্র উত্তাল এবং দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৯ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য অনুকূল হলেও মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ভার্টিক্যাল উইন্ড শিয়ারের কারণে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। সর্বোচ্চ এটি মৌসুমি নিম্নচাপ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

বিডব্লিউওটি আরও জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার ভারতের রাজস্থানের কিছু স্থান থেকে বিদায়ের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশ থেকে মৌসুমি বায়ু বিদায় নিতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। স্বাভাবিকভাবে ১০ অক্টোবরের পর উত্তরাঞ্চল দিয়ে বিদায় শুরু হয়ে ১৪ বা ১৫ তারিখের মধ্যে সারা দেশ থেকে বিদায় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বর্তমান লঘুচাপের কারণে এ প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিলম্ব হতে পারে। আগামী কয়েক দিনে লঘুচাপটি প্রথমে নিম্নচাপ ও পরে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ভারতের ওডিশা-অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল হয়ে উত্তরাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি বিদায়ের আগে সাগরে আরও একটি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে। এটিও বিদায় প্রক্রিয়ায় কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে সব আবহাওয়া প্যারামিটার বিশ্লেষণ করে বিডব্লিউওটির মূল্যায়ন, এ বছর মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশ থেকে প্রায় স্বাভাবিক সময়েই বিদায় নিতে পারে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তৃতীয় সপ্তাহের প্রথম ভাগের মধ্যেই মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি বিদায় নিতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্ধিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।

উল্লেখ্য, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মৌসুমি পূর্বাভাসে এ সময়ে বঙ্গোপসাগরে চার থেকে ছয়টি লঘুচাপ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া তিন থেকে পাঁচ দফা মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম ও তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছিল।

বিদায়ী আগস্টে বঙ্গোপসাগরে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়। সর্বোচ্চ ১৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয় নোয়াখালীর হাতিয়ায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্য নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় নিয়ে এখনই আতঙ্কিত না হয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত সতর্কবার্তা অনুসরণ করা উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন