বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২৫টি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ৪৫ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও প্রথম সারির কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসছেন। সফরকালে তারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের আশা, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি জানান, শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং মার্কিন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা, আইসিটি উপদেষ্টা এবং মুখপাত্র মাহদী আমিন।
মাহদী আমিন বলেন, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং দেশ একটি ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গত প্রায় পাঁচ মাসে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী যে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেগুলোরও প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টির মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ মতবিনিময় করেছে।
মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী ও অর্থবহ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশে কীভাবে আরও বেশি বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যায় এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বৃদ্ধি, আমদানি কার্যক্রম গতিশীল করা এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়।
তিনি জানান, এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫টি শীর্ষ শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ৪৫ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী বাংলাদেশ সফরে আসবেন। তারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। সরকারের আশা, এ সফর বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশ সম্পর্কিত তাদের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ইতিবাচকভাবে সংশোধন করে বাংলাদেশকে লেভেল-৩ থেকে লেভেল-২-এ উন্নীত করেছে। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে এবং বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরছে।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রও স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছে যে তারা আরও বেশি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে আসতে, এখানকার সম্ভাবনা অন্বেষণ করতে এবং দেশের নতুন অর্থনৈতিক সুযোগগুলো প্রত্যক্ষভাবে দেখতে উৎসাহিত করছে। সরকারের লক্ষ্যও বাংলাদেশের সক্ষমতা, স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা।
মুখপাত্র বলেন, শনিবারের বৈঠকের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে অধিকতর মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে সরকার বিশ্বাস করে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে। পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরও গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তার বক্তব্যেও বৈঠকের ইতিবাচক দিকগুলো প্রতিফলিত হয়েছে। সরকার বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র অতীতের মতোই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে পাশে থাকবে এবং ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত আস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও বাংলাদেশের প্রতি আস্থা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
মাহদী আমিন জানান, শনিবারই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একাংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
তিনি বলেন, সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের বিভিন্ন মতামত ও সমস্যা শুনেছেন। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে রাষ্ট্রব্যবস্থা, বাণিজ্য, শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো দূর করার উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
মুখপাত্র বলেন, গত পাঁচ মাস ধরে নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে বিএনপি সরকার এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। সে কারণে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা তাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন এবং সেগুলোর সমাধানের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, বিশেষভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বেসরকারি খাতের জন্য আরও কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
এছাড়া বিসিক, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) পরিচালিত শিল্পাঞ্চলে কীভাবে আরও বেশি বিনিয়োগ আনা যায় এবং বিদ্যমান জটিলতা দূর করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
মাহদী আমিন বলেন, সরকার এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পাবে এবং আরও বিকশিত হবে। সে লক্ষ্যেই সরকার একটি ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট দিয়েছে এবং সেই বাজেটের নীতিগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য দেশের বিপুল জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগানো। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থান এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে।
মুখপাত্র জানান, নির্বাচিত সরকারের জনবান্ধব বাজেট ও গণমুখী নীতিমালাকে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবসময় যে নীতি অনুসরণ করেন— "করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ"— সেই দর্শনকে সামনে রেখেই সরকারের সব উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং জনগণকে আরও বেশি ক্ষমতায়িত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এবং সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক খান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


