পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবিডুবি করছে, মাগরিবের আজান হতে বাকি অল্প সময়। ইফতার করতে ব্যস্ত হয়ে ঘরে ফেরে নগরবাসী। চারদিকে তখন তৈরি হয় পিনপতন নীরবতা। ঠিক তখন থেকেই ইফতারের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফুটপাত অথবা খোলা জায়গায় বসে পড়েন নিম্ন-আয়ের মানুষ। সেই সঙ্গে কাজের সন্ধানে বাইরে থাকা বাসের ড্রাইভার, হেলপার, রিকশাওয়ালা ও সিএনজিচালকদের পথের মাঝেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে ইফতার করতে দেখা যায়। সারাদিন কাজ করে অল্প আয়োজনের এ ইফতারে তাদের তৃপ্তি ও শুকরিয়া আদায়ে কোনো কমতি নেই।
কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধু নিয়ে, কেউবা তার কাজের সঙ্গী নিয়ে বসে যান ইফতারে। ইচ্ছা থাকলেও সাধ্য না থাকায় নামিদামি হোটেলে তারা ইফতার করতে পারেন না। তাই নির্ভর করতে হচ্ছে ফুটপাতে তৈরি এসব ইফতারির ওপর। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের প্রতিদিনের এসব ইফতার আইটেমের মধ্যে রয়েছে ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পেঁয়াজু, খেজুর, আলুর চপ ও জুসসহ সাদামাটা ইফতারির ওপর। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ফুটপাতে মুখরোচক বাহারি ইফতারি বিক্রি করা হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার রোজার দ্বিতীয় দিনে সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, নিউমার্কেট, ফার্মগেট, মহাখালী, তেজগাঁও, আগারগাঁও নতুন রাস্তা, সমাজকল্যাণ মোড়, নির্বাচন ভবনের সামনের সড়ক ও পাসপোর্ট অফিস এলাকায় বেশ জমে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ ইফতারির দোকানগুলো। প্রতিদিন দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় এসব দোকানের কর্মযজ্ঞ। তিনটার পর থেকেই শুরু হয় বিক্রি। অফিসফেরত লোকজনই এখানকার বেশি ক্রেতা। বাসায় যাওয়ার পথে নিয়ে যান ইফতারি।
কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট এলাকায় রিকশা চালান ৪৫ বছর বয়সী রবিউল ইসলাম। নাটোরের এই ব্যক্তি প্রায় ১০ বছর যাবৎ রিকশা চালান এ নগরীতে। বছরের ১১ মাস সবার মতো এক রকম চললেও রোজার মাসটি একটু ব্যতিক্রম তার। কারণ রোজায় অন্য মানুষরা বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ইফতার করে। কিন্তু পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকায় তাকে ইফতার করতে হয় রাস্তায়। কখনো একা, আবার কখনো কয়েকজন চালকের সঙ্গে মিশে ইফতার করেন। রাস্তার পাশে ইফতার করতে কেমন লাগেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন রোজার দিন। দিন শেষ হলে কয়েকজন মিলে একসঙ্গে ইফতার করি। সবার সঙ্গে ইফতার করে অনেক আনন্দ পাই। সামান্য ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি কিনে ইফতার করি- এটাই আমার বড় তৃপ্তি।’
তিনি আরো জানান, ফুটপাতে ইফতার সারছেন, তাতে কোনো দুঃখ নেই তার। রমজান মাস পেয়েছেন, তাতেই খুশি তিনি।
আগারগাঁও আইডিবির সামনেই পসরা সাজিয়ে বসেছেন টং দোকানি মনির হোসেন। তার কাছে ১১ আইটেমের ইফতারসামগ্রী পাওয়া যায়। এর মধ্যে মুড়ির প্যাকেট ৭০ টাকা (৫০০ গ্রাম), সবজি পাকোড়া ১০ টাকা, পেঁয়াজু ১০ টাকা, আলুর চপ ৫ টাকা, বেগুনি ৫ টাকা, ডিম চপ ১০ টাকা, চিকেন সাসলিক ৩০ টাকা, ছোলা ২০০ টাকা কেজি, বুন্দিয়া ২০০ টাকা কেজি, জিলাপি (মোটা) ২৫০ টাকা কেজি, জিলাপি (চিকন) ৩০০ টাকা কেজি।
একটু সামনে গেলে দেখা যায়, সমাজসেবা অফিসের সামনে ইফতারের বিশাল পসরা নিয়ে বসেছেন মোহাম্মদ ইসমাইল। তিনি ছোলা ১৮০ টাকা কেজি, পেঁয়াজু ৫ টাকা, আলুর চপ ৫ টাকা, বেগুনি ৫ টাকা, চিকেন টিকা ১০ টাকা, জালি কাবাব ১৫ টাকা, বাঁধাকপির পাকোড়া ১০ টাকা, বুন্দিয়া ২০০ টাকা কেজি, জিলাপি (মোটা) ২০০ টাকা কেজি ও চিকন জিলাপি ৩০০ টাকা কেজি বিক্রি করছেন।
শাহবাগ মোড়ে প্রতিদিন দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে ইফতার করেন ফুলশ্রমিক নাজমা বানু। স্বামী নেই, চার ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসার চলে রাস্তায় ফুল বিক্রি করে। এর মধ্যে বড় ছেলে ও এক মেয়ে গ্রামে দাদির কাছে থাকে। দিন শেষে সন্তানসহ অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ইফতার করতে কেমন লাগছেÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে ইফতার করতে ভালোই লাগে। মেয়াডা রোজা থাহে, আর ছেলেডার বয়স ছোড হওয়ায় রোজা রাখতে পারে না। ইফতারে যা জোগাড় করতে পারি, তা দিয়ে খুশিতে ইফতার করি।’
বগুড়া থেকে ঢাকায় কাজ করতে এসেছেন নাঈম শেখ। এই ফেরিওয়ালা বন্ধুকে নিয়ে ইফতার করেন ফুটপাতে বসেই। আক্ষেপ করে জানালেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ইফতার করা দুষ্কর হয়ে পড়ছে। সামান্য ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু আর বেগুনি কিনতে অনেক পয়সা চলে যায়। কোনো ফল কিনে খাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না বলে জানান নাঈম শেখ আর তার বন্ধু করিম মিয়া।
মৌসুমি ইফতারি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোও ফুটপাতে ইফতারির পসরা সাজিয়েছে। খোলা পরিবেশেই বিক্রি করা হচ্ছে জিলাপি, হালিমসহ তেলে ভাজা বিভিন্ন ইফতারসামগ্রী। বড়বাজার এলাকায় খোলা আকাশের নিচে বিক্রি হচ্ছে ইফতারির প্রিয় ফল খেজুর।
কেউ কেউ গ্রাহকের মন জয় করতে পলিথিনে ঢেকে রেখেছেন এসব ইফতারসামগ্রী। আবার কেউবা খোলা পরিবেশেই বিক্রি করছেন। শত শত মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে ইফতারি কিনছেন।
ফার্মগেটে বাস থামিয়ে ইফতার করছিলেন মিরপুরগামী বাসের হেলপার সুমন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবন এভাবেই চলে। তাই রাস্তায় বসেই ইফতারি সারতে হচ্ছে। তবে ইফতারি আইটেমের দাম বেশি হওয়ায় ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সব জিনিসের দাম ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। যার কারণে ইফতারি আইটেমও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বেশি দামের ইফতারি কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই রোজা রাখেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইফতারি করেন। তিনি জানান, সন্ধ্যায় একসঙ্গে ইফতারের মজাটাই আলাদা। পরিবারের সঙ্গে ইফতারের সময় পাই না। তাই দুই সহকর্মী মিলে মজা করে ইফতার করছি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুটপাতের খাবারে অনেক সময় ক্ষতিকর মসলা ও রং ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব খাবার দেখতে আকর্ষণীয় ও মুখরোচক হয়। দিনভর রোজা পালন শেষে কোনো অবস্থাতেই তেলে ভাজা এসব খাবার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। অন্যদিকে খোলা জায়গায় প্রদর্শন করা এসব খাবারে ধুলা থেকে জীবাণু ছাড়াতে পারে। যা থেকে পেটের পীড়া ও বদহজম হতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি কিডনি, লিভারের ক্ষতিসহ বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা থাকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

