আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

তুমুল বিতর্কের পর সংসদ মূলতবি প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতার

আমার দেশ অনলাইন

তুমুল বিতর্কের পর সংসদ মূলতবি প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতার
ফাইল ছবি

জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫, আদেশ নম্বর-১ এর ১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে মূলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি।

রোববার বিকেলে সংসদ অধিবেশনে স্পিকারের অনুমতি পেয়ে তিনি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ সময় তিনি বিগত সাড়ে ১৭ বছরে যারা জুলুমের শিকার হয়ে জীবন দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, আহত ও পঙ্গু হয়েছেন, আয়নাঘরের শিকার হয়েছেন-তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

বিজ্ঞাপন

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আজকের সংসদটি গতানুগতিক কোনো সংসদ নয়। এবং স্বাভাবিক ধারায় এটি গঠিত হয়নি। এ সংসদ বিশেষ একটি প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে। আমরা এখানে যারা আছি, সবাই কমবেশি একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের যাতাকলে পিষ্ট ছিলাম। জেলে ভাত না খাওয়া মানুষ বোধহয় এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেউ থাকলে তারা খুবই ভাগ্যবান। তারা হয়তো দেশেই ছিলেন না, এজন্য জেলের ঠিকানা খুঁজতে হয়নি।

এটাও ঠিক যে, সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন, সংগ্রাম, লড়াই করেছি, কিন্তু তার কোনো সুফল আমরা হাতে তুলে নিতে পারিনি। এরমধ্য দিয়ে আমাদের অনেককেই জেলে রেখে একটা আমি-ডামি নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনের পরে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে আমাদের তরুণ-যুবসমাজের একটি দাবিকে অগ্রাহ্য করা ও গায়ের জোরে দমনের পথ বেছে নেওয়ার কারণে তারা জীবনবাজি রেখে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিল, নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাই। সেই আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষ মজলুম মানবতা তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল। আন্দোলন সফল হওয়ার প্রেক্ষাপটেই সময়ের ধারাবাহিকতায় আজকের এই সংসদ। এই সংসদ ফ্যাসিবাদের মুলোৎপাটনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে হয়েছে। আবার যাতে ফ্যাসিবাদ না ফিরে আসে, এজন্য আমরা সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে সর্বসম্মতিক্রমে স্বাক্ষর করে আমরা এখানে এসেছি।

বিবৃতিটি পাঠ করে জামায়াতের আমির বলেন, আমাকে কেন এই নোটিশটি দিতে হলো? সেটিই দু:খের বিষয়। জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এর ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের প্রদত্ত রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনে বর্ণিত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। যা ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে আহ্বান করার কথা ছিল। বিষয়টি আমি গত ১৫ মার্চ সংসদে উত্থাপন করি। স্পিকার এ ব্যাপারে আমাকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রদানের জন্য পরামর্শ দেন। সেই নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী কার্যপ্রণালী বিধির-৬২ বিধি অনুসারে এই জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সংসদে মূলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিশ প্রদান করেছি। এমতাবস্থায় জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর বাস্তবায়ন প্রস্তাবনায় বর্ণিত পরিস্থিতি ও কারণ উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে বলে আমি মনে করি।

তিনি বলেন, যেহেতু সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় দেশে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংগঠিত ছাত্রজনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপায়ের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং যেহেতু ওই গণঅভ্যুত্থানের ফলে চব্বিশের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকারিতা এবং স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়।

যেহেতু রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করার উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচারবিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমনব্যবস্থা সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষে ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং ওইসব কমিশন স্ব স্ব প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করে।

তিনি বলেন, যেহেতু এসব প্রতিবেদনগুলোতে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। এবং যেহেতু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সংবিধান সংস্কারসহ অন্যান্য সুপারিশ সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রণয়ন করে এবং রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো তাতে স্বাক্ষর ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে।

তিনি বলেন, যেহেতু সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন এবং সে অনুযায়ী গণভোট অনুষ্ঠান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং ওই পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার করার আবশ্যকতা রয়েছে, এবং যেহেতু এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা একান্ত প্রয়োজন, সেহেতু ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করে। বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একইদিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়। জনগণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেন। ফলে সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ গ্রহণে আইনানুগভাবে বাধ্য। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির সংষদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করেননি। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই গ্রহণ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার পর ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। জাতির প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে এ ধরণের অচলাবস্থা কাম্য নয়। এমতাবস্থায় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫, এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান সংক্রান্ত আলোচনার জন্য সংসদ মূলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করছি।

পরে স্পিকার ৩১ মার্চ দুই ঘন্টার জন্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য রুলিং দেন।

এর আগে বিরোধীদলীয় নেতার এই নোটিশ উত্থাপন নিয়ে সংসদে সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় নেতাদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। স্পিকার প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির ওপর আলোচনা শেষে এ বিষয়ে নোটিশ উত্তাপনের সুযোগ দেওয়ার কথা জানালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন