বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকার সমস্যা সমাধানে নতুন করে ভাবতে হবে। রাজস্ব আয়ে অটোমেশন এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি বন্ধসহ একাধিক উদ্যোগ নিলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা কেটে উঠবে।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের প্রথম সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেছেন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: দুদক, এনবিআর, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে সেশনটি আয়োজিত হয়।
আলচনায় অংশ নেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ, বিডিজবস-এর সিইও ফাহিম মাসরুর, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, এবং চার্টার্ড ফাইনান্সিয়াল এনালিস্ট আসিফ খান। সেশনটি পরিচালনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহবায়ক জাবেদ রাসিন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। এছাড়াও সেশনে বক্তব্য রাখেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ক্যাশলেস ও পেপারলেস এবং এনআইডি-অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে কর ও শুল্ক অটোমেশন করা এখন সময়ের দাবি। আরজেএসসির সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ১ কোটি ২৮ লক্ষ টিআইএনধারী আছে। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছে সাড়ে ৫ লাখের মতো অর্থাৎ ৫ শতাংশও না। আবার আমাদের রেজিস্টার্ড বিজনেস প্রতিষ্ঠান আমাদের প্রায় ১ কোটির উপরে কিন্তু বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ আয়কর রিটার্ন দেয়। এর কারণও আছে। আয়কর রিটানে বর্তমানে সনাতনী পদ্ধতিতে অনেক জটিলতা রয়েছে। তো এটাকে আমরা অটোমেশন করে এনআইডি কার্ডের সাথে ইন্টিগ্রেটেড করে ফেলতে পারলে টেবিলের নিচ দিয়ে যে কম্প্রোমাইজ হয়, তাও প্রায় শূন্যে নিয়ে আসা যাবে। ইউরোপীয়ান অনেক দেশে অনেক বছর ধরে এই অনুশীলন আছে।
দ্বিতীয়ত, দেশের যে জ্বালানি সংকট, পাম্পের দীর্ঘ লাইন কমে যাওয়ার পরও আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ আমাদের ফুয়েল আমদানিনির্ভর। আমাদের দেশে লোডশেডিংয়ের কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যেক বছর ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু ভারত তাদের এনার্জি সোর্স বৈচিত্র্যময় করতে পেরেছে। তারা রিনিউয়েবল এনার্জিতে চলে গেছে। পাকিস্তান রিনিউয়েবল এনার্জিতে চলে গেছে। ফলে ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব কিন্তু পাকিস্তান, উরুগুয়ে, কেনিয়াতে পড়েনি। ফলে আমাদেরকে নির্ভরতা থেকে বের হয়ে রিনিউবেল এনার্জিতে যেতে হবে।
সারজিস আলম বলেন, গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ দেশকে লুটের রাজ্যে পরিণত করেছে। রূপপুর প্রকল্পের বিষয়ে ইউএস ভিত্তিক ওয়েবসাইট গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প তাদের পরিসংখ্যানে বলছে, ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট করতে টিউলিপ সিদ্দিকীকে সামনে রেখে একজন নেগোশিয়েটর হিসেবে রেখে টিউলিপ সিদ্দিকী, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং শেখ হাসিনার সিন্ডিকেট শুধু একটা প্রজেক্ট থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা কমিশন নিয়েছে। যে টাকা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করে নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার ফি হিসেবে আদানির মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদীকে ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছে। আপনি তার বিদ্যুৎ ক্রয় করেন আর না করেন প্রতি বছর আপনাকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার তাকে আপনার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতো।
তিনি বলেন, গত ১৬-১৭ বছরের এই ফ্যাসিস্ট সময়ে পাচার করেছে প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকা; যেটা দিয়ে ৩৫-৪০ টা পদ্মা সেতু নিমেষেই বানানো যেতো। হাসিনা নির্লজ্জভাবে বলছে তার পিয়নেরই প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আছে। তার ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের শুধু লন্ডনে বাড়ি ৩৬০ টা। মৃত্যুর পর তার প্রতি বাড়িতে একটি করে হাড় রাখলেও অনেক বাড়ি বেঁচে যাবে। এক সালমান এফ রহমান প্রায় ৭ টা ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। সরকারের প্রতি আহবান করবো, বাংলাদেশে যেন আগামীতে মেগা প্রকল্পের নামে মেগা ডাকাতি না হয়।
বিডিজবস-এর সিইও ফাহিম মাসরুর বলেন, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব বড় সমস্যা না; সংখ্যায় এটা ৪-৫ শতাংশের কম। বাংলাদেশের মূল সমস্যা হল, এখানে যুবক তথা ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব সামগ্রিক বেকারত্বের ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। এই যুবকদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকাত্বের হার ৫০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর ৭ লক্ষ লোক ছেলেপেলে বের হচ্ছে; যাদের ৫০ থেকে ৬০ ভাগের কোন চাকরি নেই। বেকারত্ব যতটা না অর্থনৈতিক সমস্যা, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা। কিন্তু সেটি গত দুইবছরে সেভাবে আসেনি।
তিনি বলেন, আমাদের লেবার ফোর্সের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২৫ বছর আগে লেবার ফোর্সে ৩ ভাগ শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট ছিল। ১০ বছর আগে তা সাড়ে ৪ ভাগ ছিল যা এখন ১০ ভাগের বেশি হয়ে গেছে। হঠাৎ করে এই যে পরিমাণ বেড়ে গেল, এটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। আগের সরকার উপজেলা পর্যায়ে কলেজ দেয়ার মাধ্যমে অনেক বেশি শিক্ষিত বেকার বাড়িয়েছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে, বেকারদের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় অর্ধেক।
তিনি আরও বলেন, তো এই সমস্যা সমাধান করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি অবস্থা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে আগামী কয়েকবছরে বড়ো কোনো বিনিয়োগ আসছে না বলা যায়। তাহলে সমাধান হিসেবে আমাদের প্রচুর উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। আরেকটা সমাধান হতে পারে, আমাদের যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট, তাদেরকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে। আমাদের টার্গেট হবে মার্কেটগুলোতে একটু শিক্ষিত লোক পাঠানো, প্রয়োজনে সরকার তাদের লোন দিবে। কিন্তু বাংলাদেশে সে ব্যবস্থাও নেই।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ, আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে ‘ফোর বাই ওয়ান ডাইমেনশন’ দিয়ে ধরতে পারবেন। অর্থাৎ চারটা স্থানীয় ইস্যু এবং একটি বৈশ্বিক ইস্যু। চারটা ডোমেস্টিকের একটা হলো আমাদের অর্থনীতির যে চালিকাশক্তি, যেখান থেকে কর্মসংস্থান এবং প্রসপারিটি আসে, সেগুলো একেবারে স্থবির। দ্বিতীয় হলো ৫ই অগাস্টের আগে সম্পূর্ণভাবে আমাদের অর্থনৈতিক সুশাসন ভেঙে পড়েছিল। সেটা ব্যাংকের লুটপাট বলেন, জ্বালানিকে কেন্দ্র করে যে অলিগার্কিক অবস্থা কিংবা সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা এবং সেখানে থেকে লুটপাটকে বলেন, এই পুরো জিনিসটাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সুশাসন এখনও ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।
তিনি বলেন, তৃতীয় সমস্যা হল, রাজস্বের জায়গায় কোনো সংস্কার না হওয়ায়, ইনফরমাল ইকোনমিকে ধীরে ধীরে ফরমাল ইকোনমির দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগের অভাব থাকায় এবং তার সাথে অতিমাত্রায় বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা আমাদের রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চতুর্থত, আমাদের অর্থনীতির যে চালিকাশক্তিগুলা সেখানে ১৫ থেকে ১৮ বছরে সংস্কারের অভাব রয়েছে। এছাড়াও আরেকটি হল বৈশ্বিক ইস্যু। বৈশ্বিকভাবে ২০২০-২১ সাল থেকে শুরু করে কোভিড পরবর্তী অবস্থায় রেজিলিয়েন্সের নামে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন রিডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছে। জিওপলিটিক্যাল অঞ্চলে আগে যে এফডিআই এক্সপোর্ট সম্ভব ছিল, তা পাল্টে গেছে। ট্রেড প্রটেকশনিজম তথা বাণিজ্যের উদারতার পরিস্থিতি বদলে গেছে। এই বৈদেশিক বাণিজ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, আমাদের দেশে ব্যাংকিং খাতে স্থবিরতার একটি বড় কারণ গভর্নেন্সের অভাব। রাষ্ট্রে যখন ম্যাক্রো লেভেলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং পরবর্তীতে আমরা দীর্ঘ সময় ফ্যাসিজম দেখতে পেলাম। এগুলোর একটি প্রভাব সব সেক্টরে পড়ে। আমাদের ন্যাশনালাইজড কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো এখন কেউ অ্যাকাউন্ট খুলতেই নিরাপদ বোধ করেন না।
তিনি বলেন, এক জনতা ব্যাংকেরই অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ দেখা গেল যে, সেখানে ৭০ ভাগ লোন নন-ফারফর্মেটিভ। এর মানে আপনার গ্যারেজে ধরুন ১০০ টা গাড়ি আছে, তার মধ্যে ৭০ টাই বিভিন্ন রকম বিকল হয়ে আছে। এসবের বিরুদ্ধে অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তার একটি ফলাফল হল ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ। অভ্যুত্থানের পরে ১৭ থেকে ১৮ টা ব্যাংকের বোর্ডকে রিকনস্টিটিউট করা হলো। ব্যাংকের আমানত যারা রক্ষা করতে পারবেন, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো। ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংক একত্র করা হলো।
তিনি আরও বলেন, এখন বর্তমান সরকার একটি নিম্নমানের চালাকি করেছে যে, রেজ্যুলেশন হওয়ার আগে যারা ব্যাংকের মালিক ছিল, সরকার যে পরিমাণ তারল্য সহায়তা দিয়েছে, তার সাড়ে সাত পার্সেন্ট দিয়ে তারা আবার মালিকানা ফেরত চাইতে পারে। এখন ধরুন, ইসলামী ব্যাংককে সরকার ২৩০০ কোটি টাকা দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক আবার ১৫০০ কোটি টাকা শোধ করে দিয়েছে। বাকি ৮০০ কোটি টাকার সাড়ে ৭ ভাগ দিয়ে মালিকানা চাইতে পারবে। বিশেষ কিছু ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা দিতে তারা এই ব্যবস্থা করেছে।
শামস মাহমদু বলেন, বেসরকারি খাটে ঋণ বিগত কয়েক বছর ধরে কমছে। কারণ সরকার যে বাজেট করে, তার একটি বড় অংশ সে ব্যাকিং খাত থেকে নেয়। ফলে একই জায়গায় যদি সরকার ঋণ চায় এবং আমিও চাই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে ব্যাংক ঋণ দেবে। ফলে যারা ক্ষুদ্রঋণ নেয়, তাদের পথ একদম বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের জুলাই অভ্যুত্থানের একটি বড় পার্ট ছিল চাকরি তৈরি। এখন যদি ব্যবসাগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আমরা কীভাবে চাকরি তৈরি করব।
তিনি বলেন, আমরা সবসময় দুর্নীতি বিষয়ে কথা বলি। কিন্তু এটা আমাদের এত গভীরে ঢুকে গেছে যে, ধরেন আমি হজের টাকা চুরি করলাম, দেখবেন আমাকে তারপর কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি করা হয়েছে। এই মৌলিক জায়গায় সমাধান করতে না পারলে আমরা পরিবর্তন আনতে পারব না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


