স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। এর মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য বন্ধ এবং যোগ্য কর্মকর্তাকে যোগ্য স্থানে পদায়নের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে, আগস্টে ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে এবং গত ১৬ আগস্ট ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩০ জনকে লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, মানবিক কারণে কারও বিশেষ প্রয়োজন থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন। আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং সবাই যেন সমান সুযোগ পান এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যেন মানবিক ও স্বচ্ছ হয়।
জাকারিয়া তাহের বলেন, ‘আজকের কার্যক্রম মূলত নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়ন নিয়ে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছেন। আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে, যেখানে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য বিভিন্ন ধরন ও শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জোনের মধ্যেও লটারি হতে পারে।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। যোগ্যতা অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় বসানোই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে রূপপুর নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের যে বদনাম হয়েছে, সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। আমরা গণপূর্ত বিভাগকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। আমরা এখন গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে কাজ করছি। শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। এরপর রাজউক নিয়ে কাজ করব।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রতিটি বিভাগের জমিজমাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কিছু দুর্নীতির কথা শোনা যায়। আমরা ইতিমধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে একটি ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, এই সরকারের মেয়াদের মধ্যেই যতটা সম্ভব ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার চেষ্টা করছি। আমাদের কোন কোন জমি রয়েছে, কোনগুলো আমাদের দখলে আছে আর কোনগুলো দখলের বাইরে, সবকিছু চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করা হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়ে জাকারিয়া তাহের বলেন, সরকারের যেসব জমি দখল হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে কাজ চলছে। সরকারের কত পরিমাণ জমি রয়েছে, তার সঠিক তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ল্যান্ড ব্যাংকের মাধ্যমে জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত তথ্য চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আবাসন বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আবাসন নিয়ে অনেক কথা ছিল—কে আবাসন পান, কে পান না। আমরা এরই মধ্যে বিষয়টি ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছি। এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পটি চালু করব। মূল কথা হলো, আমাদের মন্ত্রণালয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁদের অধীনে একটি বিভাগ পরিচালিত হয়। এ কারণে তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করেছি। কর্মকর্তাদের অতীতের চাকরির রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে কার কোথায় পদায়ন হবে, সে বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
লটারির আওতায় কতজন নির্বাহী প্রকৌশলী থাকবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জাকারিয়া তাহের বলেন, ‘আমরা ১৫৫ জনের লটারি করছি। সব বিভাগের মধ্যেই এ কার্যক্রম হবে। তবে তিন থেকে চারটি জায়গায় হয়তো আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংসদ সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে আমরা সব জায়গায় কাজ করব। আপনাদের মাধ্যমে সবাইকে জানাতে চাই, আমাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই, শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, যেকোনো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা। ডিজিটাল ব্যবস্থা কিংবা লটারির মাধ্যমে যেভাবেই হোক, উদ্দেশ্য একটাই।
গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, লটারির মাধ্যমে আগে পদায়ন করা হয়েছে, যা প্রশংসিত হয়েছে। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের কাজে গতিশীলতা এসেছে।
আলোচনা পর্ব শেষে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বক্স থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন কার্যক্রম শুরু করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী, অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলমসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এবং সাংবাদিকেরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


