জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার এবং গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের মুখোমুখি হয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
রোববার বিকালে রাজধানীর বিরাম ফাউন্ডেশনের অডিটোরিয়ামে জুলাই রেজুলেশন অ্যালায়েন্স (জেআরএ) আয়োজিত ‘জুলাই বিপ্লববিষয়ক প্রথম সম্মেলনে’ এ ঘটনা ঘটে।
অনুষ্ঠানে মাহদী আমিন বক্তব্য দিতে ওঠার মিনিট তিনেক পরেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা একযোগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন এবং দ্রুত এসব দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। এসময় বেশ কিছুসময় ধরে হট্টগোল চলতে থাকলে আয়োজকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন পরিবেশ শান্ত করার। এক পর্যায়ে উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী মঞ্চে গিয়ে উপস্থিত সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। এতেও শান্ত না হওয়ায় একপর্যায়ে বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে চাইলে উপস্থিত বিক্ষুব্ধরা তার পথরোধ করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি পুনরায় মঞ্চে উঠে জুলাই সনদের বিষয়ে বক্তব্য দেন।
মাহদী আমিন বলেন, তিনি উপস্থিতদের আবেগ ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বর্তমান সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জুলাইয়ের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও বৈষম্যহীন একটি সত্যিকার সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার আদর্শ বাস্তবায়নে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত অনেকেই আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি—কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, অনেকে এখনও চিকিৎসাধীন। তাদের এবং শহীদ পরিবারের পাশে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা নিয়ে দাঁড়ানোর এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, আদর্শ ও মূল্যবোধ ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের প্রভাব অল্প সময়ে সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয় বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, তবুও শহীদদের আত্মত্যাগ ও তাদের পরিবারের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, তিনি আজ সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করছেন, যে দলের চার শতাধিক নেতাকর্মী জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও তার পূর্ববর্তী আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন এবং হাজারো মানুষ গুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক ঐক্যে বিশ্বাসী সবাইকে একই আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
সংগঠনের চেয়ারম্যান সালেহ মাহমুদ রায়হানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সরকার দলীয় হুইপ ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি, সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন, মাহমুদা হাবিবা, মারদিয়া মমতাজ ও সানজিদা ইসলাম তুলি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান প্রমুখ।
জুলাই বিপ্লবের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে আখতার হোসেন এমপি বলেন, সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রীরা জুলাই সনদ নিয়ে মুখে এক কথা বললেও বাস্তবে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, তাই বিপ্লব শেষ হয়ে যায়নি—পুরোপুরি সফল না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না বলে জানান তিনি।
এর আগে অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতি নিয়ে দীপ্তি চৌধুরীর উপস্থাপনায় এক সংলাপে অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আশরাফ কায়সার এবং বিডিজবস ডটকমের সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর। বক্তারা বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেলেও যেসব মিডিয়া, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও ব্যবসায়ী তাকে সহযোগিতা করেছিল তারা এখনো বহাল তবিয়তে আছে এবং সুযোগ পেলেই জুলাই অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পূর্ববর্তী শাসনকে জায়েজ করার বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এ প্রসঙ্গে তারা সবাইকে সচেতন থেকে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও ২৫টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত হওয়া জুলাই সনদ নিয়ে বাস্তবায়নের দাবি এখনো বিভিন্ন মহল থেকে জোরালোভাবে উঠছে, আর সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বারবার পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


