মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে রমজানকে ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি, দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে উল্লেখ করে নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি বা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে, আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দেশকে নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই।
গতকাল বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ভাষণটি বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। এর আগে দায়িত্ব পালনের দ্বিতীয় দিন গতকাল ব্যস্ততম সময় পার করেন তিনি।
তাঁবেদার মুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জবাবদিহিমূলক নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছেন। সরকারের দায়িত্ব এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব অঙ্গীকার পূরণ করা। আমরা পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি। অঙ্গীকার পূরণের এ যাত্রাপথে আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও দেশবাসীর অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।
দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন—দেশ ও জনগণের জন্য তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে সফর করে তিনি সে ‘প্ল্যান’-এর নানা দিক জনগণের সামনে তুলে ধরেন। জনগণ স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ। অঙ্গীকার পূরণের এ যাত্রাপথে ভবিষ্যতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।’
বক্তব্যের শুরুতে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় এবং হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পেরেছি। তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দেশে গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এ যাত্রালগ্নে আমি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের কারণেই দেশে আবার মানুষের অধিকার সম্মান এবং মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
দেশবাসীকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, তথা দলমত-ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এ দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এ দেশকে আমরা একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কারণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা। সারা দেশে জুয়া এবং মাদকের বিস্তার বর্তমান সরকারের আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। কাজেই জুয়া এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব রকমের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আহ্বান
দেশবাসীকে রমজান মাসের শুভেচ্ছা জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। ‘আত্মশুদ্ধি’ শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করলে এ মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। আমাদের অনেকের মধ্যেই এ মাস ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। তিনি বলেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে রমজানকে ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের প্রতি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে, রাষ্ট্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সব ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেটে ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সাধারণ উভয়ের স্বার্থরক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়। সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থরক্ষা হবে, এ ব্যাপারে যে কোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত। ক্রেতা-বিক্রেতা ও গ্রহীতা- এ সরকার সবারই সরকার। এ সরকার আপনাদেরই সরকার। আপনারাই ভোটের মাধ্যমে এ সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। আপনারাই এ সরকারের শক্তি।
রমজান মাসে রোজাদাররা বিশেষ করে ইফতার, তারাবিহ ও সাহরি- এ সময়গুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চায় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি। অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রতা সাধন প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। অফিস-আদালতে বিনা প্রয়োজনে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদতের অংশ বলেই আমি মনে করি।
এমপিদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ্রতা সাধনের আহ্বান জানানোর আগে আমি সরকারের মন্ত্রী এবং বিএনপির এমপিদের দিয়েই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না। বিএনপির সংসদীয় দলের এসব সিদ্ধান্ত ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শেরই প্রতিফলন।
যানজট নিরসনে রেলব্যবস্থার উন্নয়ন
রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণহীন যানজটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, হাট-মাঠ-ঘাটে, অফিস-আদালতে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ তার নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসাবাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে, সঠিক সময়ে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেল, নৌ, সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা সহজ, সুলভ এবং নিরাপদ করা গেলে একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।
জনসংখ্যা হবে জনসম্পদ
আমাদের চারপাশে সমস্যার শেষ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও কিন্তু কম নয়। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এ জনসংখ্যাই হবে জনসম্পদ । নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ববাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তথ্যপ্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং সচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধা ও জ্ঞানবিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যত রকমের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সব রকমের সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
সবার জন্য সমানাধিকার
সরকারপ্রধান তারেক রহমান বলেন, যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, দেননি কিংবা কাউকেই ভোট দেননি—সবার অধিকার সমান। ‘দলমত ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এ নীতিতে বিশ্বাস করে সরকার কাজ করবে বলে তিনি জানান। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর সুস্থতা ও নিরাপত্তা কামনা করে বলেন, আল্লাহ যেন সব ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তৌফিক দেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

