ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর দাপট

ঢাকার বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর দাপট
মশা নিয়ন্ত্রণে ধোঁয়ার ব্যবহার অতটা কার্যকর নয় বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। ফাইল ছবি

বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুলাই থেকেই বাড়ছে। তবে আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই জুলাইয়ের চেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০০-এর বেশি।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৭৬ জন। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি মানুষ।

অন্যান্য বছরের মতো এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ শুধু রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে কোন এলাকায় ডেঙ্গু দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং সামনে কোথায় পরিস্থিতি বেশি খারাপ হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। এ কারণে সামনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

ঢাকার বাইরে বেশি সংক্রমণ যে পাঁচ জেলায়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি মানুষ। এ সময়ে ঢাকায় মারা গেছেন ৩৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে ঢাকাতেই সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি।

ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে খুলনা জেলায়। এ জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকেও খুলনা শীর্ষে। সেখানে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৪ জন।

এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। সেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৯১ জন। মারা গেছেন তিনজন।

আক্রান্তের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশালের পিরোজপুর। এ জেলায় এ বছর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন একজন।

চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ জেলা। সেখানে ৯২৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ছয়জন।

ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ৭২০। তবে সেখানে ডেঙ্গুতে কারো মৃত্যু হয়নি। এই বিভাগের শুধু মানিকগঞ্জে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

কেন এই পাঁচ জেলা বেশি ঝুঁকিতে

একসময় ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যেত। এবার ঢাকার বাইরের কয়েকটি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় বেশি।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, এ বছর উপকূলীয় অঞ্চলে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে এর উপস্থিতি বেশি।

এর একটি কারণ হিসেবে উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা এবং বছরজুড়ে বৃষ্টির পানি মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

ডা. মুশতাক বলেন, কোনো পাত্র বা স্থানে ৪৮ ঘণ্টার বেশি পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। লার্ভাও তৈরি হতে পারে। সংরক্ষিত পানিতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করলে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব। কিছু এলাকায় এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও সব লবণাক্ত এলাকায় একইভাবে সচেতনতা কার্যক্রম হয়নি।

গাজীপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপের পেছনে ঘনবসতি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন ডা. মুশতাক।

তার মতে, নিম্ন আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ব্যক্তিগতভাবে ওই এলাকার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। পরিবেশের মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন।

ময়মনসিংহের ক্ষেত্রেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পানি জমে থাকার মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড় চট্টগ্রাম বিভাগে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে চট্টগ্রাম জেলা দ্বিতীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গাছপালাযুক্ত এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে। তবে শুধু এ কারণে ডেঙ্গু ছড়ায় না।

ডা. মুশতাক বলেন, চট্টগ্রাম ও ঢাকা একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাহাড়ি এলাকা জনবিরল হলে সমস্যা কম। কিন্তু পাহাড়ি এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাতীয় নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি যেসব এলাকায় পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি, সেসব এলাকাতেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হতে পারে।

তিনি বলেন, আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় মানুষ অনেক সময় নিরাপদ নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন পাত্রে জমিয়ে রাখেন। দীর্ঘ সময় এভাবে পানি সংরক্ষণ করা হলে এসব পাত্র এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।

ডেঙ্গু বাড়ার পেছনে আরও যেসব কারণ

পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। বাংলাদেশে বেশি দেখা যায় এমন ক্ষতিকর মশার মধ্যে অ্যানোফিলিস, এডিস ও কিউলেক্স অন্যতম।

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ছড়ায়। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ছড়ায়। আর কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ হতে পারে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস এলবোপিকটাস জাতের মশা।

কীটতত্ত্ববিদ মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এডিস ইজিপ্টাই প্রধানত শহরকেন্দ্রিক। অন্যদিকে এডিস এলবোপিকটাস বেশি দেখা যায় গাছপালাসমৃদ্ধ গ্রামীণ এলাকায়।

হাঁড়ি-পাতিল, প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান, দইয়ের পাত্রসহ বিভিন্ন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস ইজিপ্টাই বংশবিস্তার করে। এ কারণে এই মশাকে ‘কন্টেইনার ব্রিডিং মসকুইটো’ বলা হয়।

অন্যদিকে গাছের কোটর বা কচুর পাতার গোড়ার মতো প্রাকৃতিকভাবে পানি জমে থাকা স্থানে এডিস এলবোপিকটাসের প্রজনন হয়।

মনজুর আহমেদ চৌধুরীর মতে, ডেঙ্গু ছড়ানোর ক্ষেত্রে এডিস ইজিপ্টাই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর বাহক। তবে কোনো কোনো এলাকায় এডিস এলবোপিকটাসই প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে।

এমন এলাকাও রয়েছে, যেখানে এডিস ইজিপ্টাই পাওয়া না গেলেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কীটতত্ত্ববিদদের মতে, আগে শহর এলাকায় এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেলেও নগরায়নের প্রভাবে এখন গ্রামেও এই মশা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামেও এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ বেড়েছে।

মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুই-তিন দশক আগে ঢাকার যেসব এলাকায় নিয়মিত পানির সংকট ছিল, সেখানে মানুষ ড্রাম ও বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখতেন। পুরান ঢাকার কিছু এলাকা ও এলিফ্যান্ট রোডের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পানির সংকটের কারণে এসব এলাকায় ড্রামে পানি সংরক্ষণ করা হতো। এতে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতো।

এখন পরিস্থিতি আরো বদলেছে। মানুষের মাথাপিছু আয় ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পাত্রের ব্যবহারও বেড়েছে। আগে যত হাড়িপাতিল ও পাত্র ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি। বেড়েছে ছাদবাগানও। গ্রামেও অনেকে প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান করেন। বিশেষ করে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক শহর ও গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে দিয়েছে।

ফলে শহর ও গ্রামের উভয় এলাকাতেই এডিস মশার জন্য নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে।

এ ছাড়া সারাদেশে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার পেছনে আবহাওয়া এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঘাটতির কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। এতে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সারাদেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে সিটি করপোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধি নেই। ফলে মশা নিধনের কাজও সেভাবে হয়নি। এতে মশার সংখ্যা বেড়েছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু কবে

বাংলাদেশে কবে থেকে এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

১৯৯৮ সালে কিছু রোগীর দেহে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরের বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর অনেক রোগীর দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু পাওয়া যায়।

২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ে। তখন থেকেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক প্রচারণা ধীরে ধীরে শুরু হয়।

অধ্যাপক মুশতাক হোসেন বলেন, অতীতে এডিস মশা থাকলেও ডেঙ্গু শনাক্তের সুযোগ কম ছিল। তাই এ মশার উপস্থিতি নিয়ে তখন এত গবেষণা বা উদ্বেগের সুযোগ ছিল না। এখন সেই সুযোগ বেড়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা প্রকট আকার ধারণ করে ২০১৯ সালে। ওই বছর এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। মারা যান ১৭৯ জন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন