গুজব, অপতথ্য ও মানহানির মতো অভিযোগে মামলা ও শাস্তির সুযোগ রেখে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের আশঙ্কা, এসব অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে যৌক্তিক সমালোচনা ও মতপ্রকাশও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল টাওয়ারে ‘আবারও হুমকির মুখে বাক্স্বাধীনতা? সংশোধিত সাইবার আইন কতটুকু বিতর্কিত, কতটুকু ডিএসএ-এর প্রতিচ্ছবি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। এ বৈঠকের আয়োজন করে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও আইনে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গুজব, অপতথ্য ও মানহানির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা সীমিত করার যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে মফস্বলের সাধারণ মানুষই বেশি ভুক্তভোগী হতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দেশে জুলুমের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছে, তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, বিভিন্ন নামে পুরোনো ধরনের ‘কালো আইন’ ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। র্যাবের নাম পরিবর্তন হলেও চরিত্র বদলায়নি—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই ন্যস্ত থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদের কথা বলার পরিসর সংকুচিত হওয়া নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ বলেন, সাইবার আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোন ক্ষেত্রে আইন করা প্রয়োজন এবং কোন ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োজন নেই, সেটি আগে নির্ধারণ করা জরুরি।
অল্টারনেটিভের সংগঠক ডা. তাজনুভা জাবীন প্রস্তাবিত শাস্তির মাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা সহিংসতার মতো অপরাধে দুই বছরের শাস্তির বিধান থাকলেও গুজব ও অপতথ্যের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত শাস্তির প্রস্তাব বৈষম্যমূলক হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, এ ধরনের বিধান নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভয়েস ফর রিফর্মের সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো নাগরিক সুরক্ষার চেয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের দিদার ভূঁইয়া প্রস্তাবিত সংশোধনীতে দায়মুক্তির বিষয়টিকে অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে কোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; বরং আইনের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, মানবাধিকার কর্মী ড. নাবিলা ইদ্রিস, সাংবাদিক জায়মা ইসলাম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল মতিন, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, সপ্রাণের রিসার্চ ডিরেক্টর জারিফ রহমান, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হুসাইন, ডিএসএ ভিকটিম নেটওয়ার্কের গোলাম মাহফুজসহ অন্যরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


