উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ করে দেওয়া হলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা পুরোপুরি সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এছাড়া অতীতের ন্যায় স্থানীয় পর্যায়ে ‘এমপি রাজ’ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তারা বলেন, অবিলম্বে স্থানীয় সরকারকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন, প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের রায় ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তারা।
এসময় সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ করে দেওয়ার ব্যাপারে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এটি একটি ভয়ানক সিদ্ধান্ত, যার মাধ্যমে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আমাদের আশঙ্কা। কারণ এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পুরোপুরি সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। এমনকি ১৯৯১ সালের মতো উপজেলা পরিষদ বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেবে।
তিনি বলেন, সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি দলের অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার জন্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত, সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়। এছাড়াও এর মাধ্যমে সর্বস্তরে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি আরো বলেন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের যথার্থ মাধ্যম। সর্বস্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অভাবে আমাদের দেশে বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে অতীতে সবকিছুই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। আর কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থাই অপচয়, অদক্ষতা ও দুর্নীতির জন্ম দেয়।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিগত সময়ে স্থানীয় সরকারের সংস্কারে গঠিত বিভিন্ন কমিটি ও কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, বিএনপি সরকার স্থানীয় সরকারের বিষয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা স্থানীয় সরকার কার্যকর ও শক্তিশালীকরণ হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই এগুলোর অধিকতর পর্যালোচনা এবং সরকারের এসব সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কবি সোহরাব হাসান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজ এলাকায় এমপিদের কার্যালয় রয়েছে, গাড়ি রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে একই ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এমপিরা যাতে কোনোভাবেই স্থানীয় সরকারে হস্তক্ষেপ করতে না পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য উপজেলা পরিষদে এমপিদের বসার জায়গা দেওয়া যাবে না। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে আমরা তা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সংবিধান স্থানীয় সরকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকারের সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং এ সংক্রান্ত সুপারিশগুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু তা না হওয়ায় আমরা নাগরিকরা হতাশ।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার বিষয়ে সরকার গত দু মাসে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা আমাদের সন্দিহান করেছে আসলে সরকার কতটুকু ক্ষমতায়ন চায়। সরকার বলেছিল এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করছে না। তাই নির্বাচনগুলো কখন হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সুজন এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, আমাদের সংসদ সদস্যদের মূল কাজ হওয়া উচিত আইন প্রণয়ন, নীতি-নির্ধারণ করা এবং সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর মধ্য দিয়ে নির্বাহী বিভাগ ও মন্ত্রণালয়গুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। অন্যদিকে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে স্থানীয় উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা হয়েছে। তাই স্থানীয় সরকারের কাজে সংসদ সদস্যরা হস্তক্ষেপ করলে স্থানীয় সরকার আরও দুর্বল হবে এবং আমাদের উন্নয়নের গতি স্থবির হয়ে পড়বে। এসময় আরো বক্তব্য রাখেন, কবি লিলি হক নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গ প্রমুখ।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

