পবিত্র রমজান মাসে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিরাপদতা ও ঝুঁকি মোকাবেলায় নতুন সরকারের কাছে নাগরিকদের ১৫ টি দাবি জানিয়েছে বিসেফ ফাউন্ডেশন।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিসেফ ফাউন্ডেশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে নাগরিকদের এসব দাবি তুলে ধরেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও নতুন সরকার জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দেশ পরিচালনার শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। সরকারের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি। বক্তাদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি খাদ্যের নিরাপদতা ও পুষ্টিমান নিশ্চিত না হলে খাদ্য নিরাপত্তার ঘোষণা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম ও শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ও দাবী থাকবে তাঁরা যেন খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৃষি ও কৃষকের সমৃদ্ধি, এবং পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য তথা এগ্রোইকোলজি বিবেচনায় রেখে টেকসই কর্মসূচী গ্রহণে অগ্রাধিকার দেন।
এসময় নাগরিক সমাজের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে নতুন সরকারের কাছে ১৫ টি সুস্পষ্ট দাবী জানায় তারা। নাগরিকদের পক্ষ থেকে আলমগীর কবির উপস্থাপিত দাবিগুলো হলো :
১. নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তা অর্থাৎ ক্ষেত থেকে পাত পর্যন্ত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষক যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারে সেজন্য প্রত্যেক বাজারে ‘নিরাপদ কৃষকের বাজার’ প্রতিষ্ঠা করা।
২. মার্কেট সিন্ডিকেটরা যাতে কোনভাবেই খাদ্যপণ্যের মজুদকরণের মাধ্যমে, বিশেষ করে রোজায় ব্যবহৃত খাদ্যসামগ্রীর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে সেজন্য কঠোর তদারকি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদক ও বিপণনে নিয়োজিত ব্যক্তি, দল/সমিতি এবং প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা সহায়তা প্রদান করা।
৪. নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসায়ীদের বিশেষ দায়-দায়িত্ব (ধারা-৪৩) এবং উৎপাদনকারী, মোড়ককারী, বিতরণকারী এবং বিক্রয়কারীর বিশেষ দায়বদ্ধতা (ধারা-৪৪) নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করা।
৫. বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রণীত 'খাদ্য-সংযোজন দ্রব্য ব্যবহার প্রবিধানমালা, ২০১৭' মেনে চলা এবং ইফতার সামগ্রী তৈরী ও বিক্রয়ের জন্য নিয়োজিত খাদ্যকর্মীগণ স্বাস্থ্যবিধান (সংক্রামক রোগমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন, অ্যাপ্রন, মাথার চুল ঢাকার ক্যাপ ও হ্যান্ড গ্লোবস পরিধান) ও খাদ্য স্থাপনা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বাধ্য করা।
৬. সকল ধরণের শরবত বা পানীয় তৈরীতে অনিরাপদ পানি বা বরফ, অননুমোদিত সুগন্ধি বা রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করলে অণুজীব ও রাসায়নিক দূষণের কারণে ঐ শরবত বা পানীয় অনিরাপদ হয়। তাছাড়া, খাদ্য বা খাদ্যোপকরণ খোলা থাকলে ধুলা-বালি, মাছি বা অন্যান্য পোকামাকড়ের মাধ্যমে তা দূষিত ও রোগ জীবাণু দ্বারা অনিরাপদ হতে পারে, তাই, ব্যাপক জনসচেতনতা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা।
৭. নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস তথা খাদ্য ব্যবস্থাপনা যেহেতু একটি সমন্বিত বিষয়, তাই এ সম্পর্কে বছরব্যাপী গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের করণীয় ও দায়িত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মত পদক্ষেপ গ্রহণে জোর দিতে হবে।
৮. রাসায়নিক উপাদান দিয়ে পাকানো ফল, বাসি-পচা, খোলা খাবার, রাস্তার পাশে খোলা জুস, খবরের কাগজে খাবার মোড়ানো, কৃত্রিম রং মেশানো খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রয়, ইত্যাদি বন্ধে কঠোর হতেই হবে।
৯. নিরাপদ খাদ্য আইনের ১৫ (১) অনুযায়ী গঠিত 'কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি'-কে কার্যকর করা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির আলোকে প্রত্যেক জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে হোটেল-রেস্তোরা মালিক সমিতি, বাজার মালিক সমিতি, ইউনিয়ন পরিষদ, নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন/প্রতিষ্ঠানসমূহ, ইত্যাদি প্রতিনিধি সমন্বয়ে প্রত্যেকটি বাজারে নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সমন্বয়ে সর্বস্তরে কমিটি গঠন করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, খাদ্যের নিরাপদতা ও ঝুঁকি মোকাবেলায় জনবান্ধব কার্যক্রম পরিচালনা করা।
১০. সারাদেশে বিএসটিআই এর পাশাপাশি "নিরাপদ খাদ্য" সীল প্রবর্তন এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদক ও বিপণনে নিয়োজিত ব্যক্তি, দল/সমিতি এবং প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা সহায়তা প্রদান করা।
১১. সারাদেশে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা জোরদার করা। আইনের অপপ্রয়োগরোধে অনুমান নয়, প্রমাণভিত্তিক ও স্থানীয় বা সামাজিক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শাস্তি নির্ধারণ করা।
১২. খাদ্যপণ্যে মেয়াদের পাশাপাশি পুষ্টিমান দৃশ্যমানভাবে বা কালার কোড ও কিউআরকোড ব্যবহারের মাধ্যমে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
১৩. নিরাপদ কীটনাশক (Biopesticides) আমদানী ও বাজারজাতকরণে বিদ্যমান বাধাসমূহ দূর করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ও আগাছানাশক নিষিদ্ধ করে নিরাপদ বিকল্পে রূপান্তরের জন্য মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং অবিলম্বে ১০টি সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ করা।
১৪. খাদ্য নিরাপদতা ও পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কিত গবেষণা ও উদ্ভাবন জোরদার করার লক্ষ্যে বিশেষ তহবিল গঠন করা এবং তৃণমূলের উদ্ভাবন ও উত্তম কৃষি ও খাদ্য চর্চা প্রচেষ্টাকে সহায়তা প্রদান করা।
১৫. একক জানালা ভিত্তিক ডিজিটাল খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (এফবিও) নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং পোর্টাল চালু করা।
বাপা সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে শুচনা বক্তব্য রাখেন শিসউক এর নির্বাহী পরিচালক সাকিউল মিল্লাত মোরশেদ, মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিকশিত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এর প্রধান নির্বাহী আতাউর রহমান মিটন।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বিসেফ ফাউন্ডেশন এর সাধারণ সম্পাদক ও সিইও রেজাউক করিম সিদ্দিক প্রমুখ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

