ঢাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর যাত্রীভোগান্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়াবে: আইপিডি

স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর যাত্রীভোগান্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়াবে: আইপিডি

ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া—এই চার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার যে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার, ঢাকার পরিবহন ও নগর বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত জনভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করে পরিকল্পনা ও উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।

বিজ্ঞাপন

আইপিডি মনে করে, কার্যকর পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহন সংযোগ নিশ্চিত না করে কেবল টার্মিনালগুলো শহরের প্রান্তে (কাঁচপুর, হেমায়েতপুর, টঙ্গী ও কেরাণীগঞ্জ) সরিয়ে নিলে যানজট সমস্যার টেকসই সমাধান তো হবেই না, বরং মানুষের যাতায়াতে চরম জনভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি বয়ে আনবে।

আইপিডি মনে করে, ২ কোটিরও বেশি জনসংখ্যাকে ধারণ করা ঢাকা মহানগরীর যাতায়াত ব্যবস্থাকে টেকসই করতে ঢাকা শহরের বর্ধিত নগর এলাকায় নতুন আরও বাস ডিপো ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যমান চারটি বাস টার্মিনাল সরানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত এবং পরিকল্পনার বিবেচনায় টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। ফলে বিদ্যমান বাস টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা দরকার বলে মনে করে আইপিডি।

সম্প্রতি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকার যানজট কমাতে ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, মহাখালী টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে ও পরে টঙ্গীর কাছে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে সরিয়ে নেওয়া হবে। আইপিডি মনে করে, ঢাকার যানজটের পেছনে এই টার্মিনালগুলোকে দায়ী না করে ঢাকার যানবাহন ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলাকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অনুরূপভাবে, এসব বাস টার্মিনালে মূল সড়কে যাত্রী ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং, চাঁদাবাজিসহ অনেক ধরনের সমস্যা বিদ্যমান আছে। সেই সব সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে টার্মিনালের আশপাশের সড়কের শৃঙ্খলা উন্নত করা সম্ভব। কিন্তু সেটা না করে টার্মিনালকে মূল শহর থেকে অনেক দূরে সরানো হলে জনগণের যাতায়াত ব্যয়, নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা, সংযোগ সড়কে চাপ এবং সামগ্রিকভাবে জনভোগান্তি আরও বেড়ে যাবে। প্রস্তাবিত চারটি টার্মিনালই মূল শহর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই সব

এলাকা থেকে মূল ঢাকা শহরে আসার জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী বাস সার্ভিস কিংবা গণপরিবহন সেভাবে নেই। রাতের বেলায় এই সব এলাকায় নিরাপত্তাঝুঁকিও আছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করা নাগরিকদের মধ্যে স্বল্পবিত্ত ও প্রান্তিক, নারী, শিশু ও বৃদ্ধ মানুষেরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে পড়বেন।

সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত আমাদের বিদ্যমান নগর, পরিকল্পনা, পরিবহন ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখেই করতে হবে বলে মনে করে আইপিডি।

ফলে বাস টার্মিনাল সরানোর বিষয়ে আইপিডির পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ ও মতামতসমূহ হলো:

সংযোগ পরিবহন ব্যবস্থা বা ফিডার সার্ভিস ও ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’র সংকট: দূরপাল্লার যাত্রীরা যখন শহরের প্রান্তের নতুন টার্মিনালে নামবেন, তখন সেখান থেকে মূল শহরে আসার জন্য যদি পর্যাপ্ত মেট্রোরেল, বিআরটি বা সুশৃঙ্খল লোকাল বাস না থাকে, তবে যাত্রীরা চরম বিপর্যয়ে পড়বেন। রাতের বেলা এই সমস্যা হবে আরও ভয়াবহ।

আর্থিক ব্যয় ও যাতায়াত সময় বৃদ্ধি: টার্মিনাল দূরে সরে যাওয়ার কারণে সাধারণ যাত্রীদের সিএনজি, অ্যাপভিত্তিক রাইড বা অবৈধ থ্রি-হুইলারে চড়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে মূল শহরে ঢুকতে হবে। এতে যাতায়াত খরচ ও সময় দুই-ই একলাফে অনেক বেড়ে যাবে।

যানজট বাড়ার শঙ্কা: যাত্রীরা ছোট ছোট বাহনে মূল সড়কে আসার কারণে সড়কের ওপর চাপ বাড়বে। ফলে শহরের প্রবেশমুখে ও বিভিন্ন সড়কে যানজট আরও বেড়ে যেতে পারে।

পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ: ঢাকার অভ্যন্তরীণ বাস সার্ভিস এবং মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এই অবস্থায় প্রতিদিনের লাখ লাখ দূরপাল্লার যাত্রীর চাপ শহরের অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন ব্যবস্থা সামাল দিতে পারবে না, যার ফলে নগরের ভেতরে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে।

নিরাপত্তা ও নারী-শিশু-বৃদ্ধদের ভোগান্তি: প্রান্তিক টার্মিনালগুলো থেকে মূল শহরে প্রবেশের সংযোগ সড়কগুলো রাতে বা ভোরে নিরাপদ না হলে যাত্রী, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন।

ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার যুক্তি হিসেবে শহরের প্রান্তে বাস টার্মিনাল থাকার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। অথচ গাবতলী, সায়দাবাদ বা গুলিস্তানের মতো এলাকাসমূহ একসময় শহরের প্রান্তে বা বাইরেই অবস্থিত ছিল। ঢাকার নগর উন্নয়নে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শহর অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এখন বাস টার্মিনাল সরানোর কথা বলছে সরকার। অথচ নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের কেন্দ্রস্থলে পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন, ভারতের দিল্লির মহারানা প্রতাপ বাস স্টেশন বা কাশ্মীরি গেট বাস টার্মিনাল, ভারতের বেঙ্গালুরুতে কেম্পেগৌড়া বাস স্টেশন বা ম্যাজেস্টিক বাস স্ট্যান্ড, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কে এল সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল, পাকিস্তানের করাচির নুমায়েশ স্টেশন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আবুধাবি সেন্ট্রাল বাস স্টেশনসহ এরকম অনেক শহর আছে, যেখানে মূল শহরের ভেতরেই আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল আছে। মূল শহরে এই ধরনের টার্মিনাল শহরের জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ হিসেবেও কাজ করে, কেননা এতে সড়কে ছোট গাড়ির পরিমাণ কমে সড়কে চাপ কমে, মানুষ সহজেই শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ঢুকতে পারে এবং মানুষের যাতায়াত সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হয়। ফলে ঢাকার বিদ্যমান চারটি বাস টার্মিনালকে সরিয়ে না ফেলে এগুলোর সর্বোচ্চ উপযোগিতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই ব্যাপারেই সরকারকে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে আইপিডি।

ঢাকার নগর বাস্তবতা ও পরিবহন পরিকল্পনার বিদ্যমান বাস্তবতায় ঢাকার বাস টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইপিডির সুনির্দিষ্ট দাবি ও সুপারিশসমূহ হলো:

১. ঢাকার চার বাস টার্মিনাল সরানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করা।

২. বিদ্যমান টার্মিনালের আশপাশের অব্যবস্থাপনা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

৩. টার্মিনালের জন্য প্রস্তাবিত এলাকায় বাস ডিপো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া, যেন বর্তমান টার্মিনালের ওপর চাপ কমানো যায়।

৪. দূরপাল্লার বাসের যাত্রীদের জন্য মানসম্মত ফিডার সার্ভিসের ব্যবস্থা করা।

৫. বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা।

৬. টার্মিনালকেন্দ্রিক রুট পারমিট এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।

৭. যাত্রীদের আসা-যাওয়ার পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

৮. সমন্বিত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে টার্মিনালগুলোতে মাল্টিমোডাল হাব তৈরি করতে হবে।

এসআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন