আইনের বাইরে গিয়ে কিছুই করিনি। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হওয়া সত্ত্বেও বিমান পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ায় ‘সমালোচনার’ জবাব দিয়েছেন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এর আগেও ২২ জন মন্ত্রী বিমান পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। আমি আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করিনি।
রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনকে গেল বছরের ২৬ অগস্ট বিমান পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এরপর বিষয়টি নানারকম আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বেও রয়েছেন।
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বিমানকে ‘লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার’ দাবি করে বশিরউদ্দীন বলেন, “এর আগে ২২ জন মন্ত্রী এবং উপদেষ্টা বিমান বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমি ২৩তম। প্রধানমন্ত্রীও বিমান বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এখানে তো আইনের কোনো বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হয়নি। সো আপনি যদি এই একটা জায়গায় নেইল ডাউন করেন আমাকে, তাহলে আমরা ফ্যাসাদ তৈরি করার জন্য অনেক আলোচনা করতে পারি।
বাংলাদেশি পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসন যে বাড়তি ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তা কমবে বলে আশাবাদী বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “আমরা আশা করছি যে ৯ তারিখে হতে যাওয়া চুক্তিতে আমরা চেষ্টা করছিলাম যে আরও কত কমানো যায় (শুল্ক)। কতটুকু কমবে এই মুহূর্তে আমি বলতে চাচ্ছি না বা পারছি না। আমরা আলোচনার ভিত্তিতে দেখব।
তিনি জানান, শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছে উড়োজাহাজ কেনা
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “আমাদের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা নেই, ১৯টা প্লেন আমাদের আছে; ইনফ্যাক্ট আমাদের প্লেন আছে ১৪টা, বাকি প্লেনগুলো ফ্লাইঅ্যাবল না।
বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, “এই প্লেন ক্রয় প্রস্তাব বোয়িং এবং এয়ারবাস একসাথে বিশ্লেষণ করে টেকনো ইকোনমিক ফিজিবিলিটি করে একটা প্রস্তাবনা পাঠানো হয়।
“এই প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এটার প্রাইস নেগোসিয়েশন করার জন্য ডক্টর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ (পরিকল্পনা উপদেষ্টা) স্যারকে হেড করে একটা নেগোসিয়েশন টিম করা হয় যেই টিম এই বোয়িংয়ের সাথে নেগোসিয়েট করছেন। এই নেগোসিয়েশন এখনো চলমান আছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গ টেনে শেখ বশির বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার মানে ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এই ৮০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘তুমি আমার কাছ থেকে যে পরিমাণ রপ্তানি করো, তার থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমার কাছ থেকে কম কিনো। সো এই যে কম তুমি কিনছো, এটা তুমি আমার ওপরে সঠিক করছো না’।
“আপনারা যদি দেখেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের রপ্তানি আয় এক লাখ কোটি টাকার উপরে। আমরা যে বিমান ক্রয়ের প্রস্তাবনা করছি, সেটার মূল্যমান হয়তোবা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা হবে। সেটা আমাদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে ১০ বছরে। ১০ বছরে ইনফ্যাক্ট আরও বেশি সময়ে; কারণ এটার পেমেন্ট শিডিউল অনেক লং টার্ম হয়তোবা ২০ বছরে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরীন জাহান লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সচিব এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রম নিয়ে বলেন, গত ১ জানুয়ারি এয়ার টিকিটের সিন্ডিকেট, টিকিট ব্লকিং রোধ করতে বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ এবং ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করা হয়। এর ফলে এয়ার টিকিটের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলগুলোকে লাইসেন্সিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। টিকিট বিতরণ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি কাঠামো প্রবর্তন করায় টিকিটের মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা-জেদ্দা রুটে টিকিটের মূল্য ১ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি হয়েছিল, যা এ বছর ৫৩-৬০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া এ মৌসুমে হজ যাত্রীদের টিকিট আগের মৌসুমের তুলনায় ৫৪ হাজার টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত হজ মৌসুমে বিশেষ হজ ফ্লাইটের মাধ্যমে হজযাত্রীদের পরিবহন করা হতো। ফিরতি পথে এ ফ্লাইটগুলো খালি আসতো। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ মৌসুম থেকে বিমান সৌদি আরবগামী নিয়মিত বা সিডিউল্ড ফ্লাইট ব্যবহার করেই হজযাত্রী পরিবহন করবে। এর ফলে ফিরতি ফ্লাইটে অতি স্বল্পমূল্যে মাত্র ২০ হাজার টাকায় ৮০ হাজার টিকিট বিক্রির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে পবিত্র ঈদ-উল-আযহার সময়ে সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী কর্মীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
লিজ নীতিমালা
সচিব বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ল্যান্ড সাইড ও এয়ার সাইডের স্থাবর সম্পত্তি ইজারা দেওয়ার জন্য এ যাবৎ অনুসৃত নীতিমালায় বিভিন্ন অসংগতি থাকায় বেসামরিক বিমান চলাচল আইনের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবিত বিধিমালায় আবেদনের ভিত্তিতে এয়ারসাইডে ইজারা দেওয়ার সুযোগ রহিত করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এবং নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো প্রকার আপস না করেই ইজারা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ইজারার শর্ত প্রতিপালন হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করার জন্য মনিটরিং টিম গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বেবিচকের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের সভাপতি করে এ কমিটিগুলো গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব কাজ সম্পাদনের জন্য চেয়ারম্যান, বেবিচককেই ক্ষমতায়িত করা হয়েছে। যদিও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিষয়টি ভুলভাবে এই মর্মে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে ইজারা প্রদানের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে, যা আদৌ সত্য নয়।
বোয়িং ক্রয় বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে জানিয়ে বিমান সচিব বলেন, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৪টি (দুটি ড্যাশ-৮ ও দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০) উড়োজাহাজ অবসরে যাবে। সে কারণে বিমান বহরে নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন করা না হলে বিদ্যমান রুটগুলোতে সুষ্ঠুভাবে ফ্লাইট পরিচালনা যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি নতুন রুটে ফ্লাইট পরিচালনাও সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্প্রতি আরোপিত ৩৭ শতাংশ রিফিফোকাল ট্যারিফের ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা নিরসন করতে সরকার ৬ বিলিয়ন বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্দেশ্যে অন্যান্য আমদানি উদারীকরণসহ ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রস্তাব করে। ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সঙ্গে সরাসরি ৫-৭ লাখ জনবলের কর্মসংস্থান জড়িত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

