রাজধানীতে আয়োজিত নাগরিক সংলাপে বক্তারা বলেছেন, দেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেন, সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে রাষ্ট্রে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে অবিলম্বে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সব রাজনৈতিক শক্তিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও জানান তারা।
রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এই নাগরিক সংলাপের আয়োজন করা হয়। ‘জুলাইয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও নতুন সংসদের কাছে নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজক করে নবগঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’। সংলাপে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জুলাই যোদ্ধাদের বেশ কিছু সংগঠন এবং কয়েকটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় নাগরিক সংলাপে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, নারী সংগঠক ও উদ্যোক্তা ফারহানা সূচি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শিব্বির আহমেদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোটের বিষয়ে এখন যে বিতর্ক হচ্ছে, তার সমাধান সংবিধানে খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু সংবিধানে এর সমাধান নেই। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ভিত্তিতে নয়, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছে। সরকার যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে এবং গণভোটে মানুষ যে রায় দিয়েছে, সেখানেই এর সমাধান আছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে বিএনপির অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টির বিষয়ে ইঙ্গি করে সুজন সম্পাদক বলেন, সরকার গঠনের শুরু থেকে বিভক্তি, অনৈক্য সৃষ্টি করে তারা কীভাবে লাভবান হবে, সেটি বোধগম্য হচ্ছে না। বরং এর মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এই জটিলতার কারণে পলাতক শক্তির ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে।
আইনজীবী শিশির মনির বলেন, রাজনৈতিক ব্যাপারে বিচার বিভাগকে জড়ানো হচ্ছে, যা অতীতে কোনো ভালো ফলাফল দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব সংবিধান মেনে হয়নি, সংবিধানের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে গেলে শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার না, বর্তমান সরকারও আদালত দ্বারা অবৈধ ঘোষণা হতে পারে।
এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু বিএনপির কাছে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সবার সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের অতীতের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ব্যাপক ভোটের নির্বাচিত সরকার খুব দ্রুতই মেয়াদ শেষের আগেই জনরোষে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের হাসনাত কাইয়ুম বলেন, রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে আদালত দিয়ে মীমাংসা করা যায় না, রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হয়। শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে আদালকে ব্যবহার করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে বর্তমান সরকার একই ভুল করবে না।
নাগরিক সমাজের পক্ষে আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যে রায় দিয়েছে, সেটিতে সবাই একমত না হলেও গণতন্ত্রের স্বার্থে সেটি মেনে নেওয়া বর্তমান সরকারের উচিত হবে। তিনি বলেন, জনগণ সংবিধানের ঊর্ধ্বে। জনগণের রায় অবজ্ঞা করা বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই। ছোটখাট মতপার্থক্যের জন্য বড় অর্জন ছুড়ে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

