বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে মিয়ানমারের জান্তা-সমর্থিত সরকার। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে যাচাইকৃত রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে ফেরত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশের তথ্য অস্বীকার করে তারা বলেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গেছে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার মানুষ আর উত্তর রাখাইনে রয়ে গেছে দুই লাখ।
গতকাল শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো মোট আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা থেকে মিয়ানমার চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের নিবন্ধিত বা সাবেক বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে তালিকায় থাকা এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যাচাই করতে পারেনি। এছাড়া ৪,২৪১ জনের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাদের ফেরত নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে নেপিদো।
বিবৃতিতে মিয়ানমার জান্তা সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রত্যাবাসন বা সশরীরে ফিরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে না।
এছাড়াও মন্ত্রণালয় রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর পাঁচ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দুই লাখের বেশি উত্তর রাখাইনে থেকে গেছে।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর তীব্র সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে প্রায় সাত লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগে আসা রোহিঙ্গাসহ বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরগুলোয় প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু।
২০১৮ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই বছর মেয়াদি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছিল। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে জান্তা সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ অঞ্চল এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তীব্র এ লড়াইয়ের কারণে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল, যার ফলে নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ থমকে গেছে।
এর মধ্যেই ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাখাইনের চলমান সহিংসতার কারণে নতুন করে আরো হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা বিদ্যমান ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে।
পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে। তহবিল সংকটের কারণে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঘিঞ্জি ও জরাজীর্ণ ক্যাম্পগুলোয় পুষ্টিহীনতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং বর্ষাকালে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এছাড়াও ক্যাম্পে কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা যুবক দালালদের খপ্পরে পড়ে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় প্রতি বছর শত শত রোহিঙ্গা প্রাণ হারাচ্ছে।
এদিকে গত জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত পাঁচ হাজার ও বাংলাদেশ থেকে সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে।
তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং সে সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, প্রত্যাবাসন কর্মসূচিটি শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার আটক কেন্দ্রগুলোয় বর্তমানে আটক থাকা যাচাইকৃত মিয়ানমার নাগরিকদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২০২৩ সালে লড়াই শুরু হয়। এতে নতুন করে আরো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বর্তমানে আরাকান আর্মি রাখাইনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে এসেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

