সুন্দরবনে ৭৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নাইলনের বেড়া

সুন্দরবনে ৭৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নাইলনের বেড়া
ছবি: সংগৃহীত।

বাংলাদেশের সুন্দরবনে মাছ ধরার নৌকা, মৌয়াল ও বাওয়ালিরা যখন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে যান, তখন তাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখোমুখি হওয়া ঠেকাতে নতুন আশা দেখাচ্ছে ‘নাইলন ফেন্স’ বা সাধারণ নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি বেড়া।

বিজ্ঞাপন

হালকা ও টেকসই এই নাইলনের বেড়া বননির্ভর জনগোষ্ঠীর চলাচল আছে এমন নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে নাজুক ম্যানগ্রোভের বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশের কোনো স্থায়ী ক্ষতি না করেই মানুষ ও বাঘের মধ্যে একটি কার্যকর ব্যবধান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, একটি তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগ ইতোমধ্যে সুন্দরবনের চারপাশে ৭৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নাইলনের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করেছে।

বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মানুষ ও বাঘের সংঘাত একটি বড় সমস্যা। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও কাঠ সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত বনের ওপর নির্ভর করেন। কাজের প্রয়োজনে তাদের প্রায়ই বাঘের বিচরণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয়।

এই নাইলন ফেন্স কংক্রিটের দেয়াল বা স্থায়ী ধাতব কাঠামোর মতো নয়। এটি তুলনামূলকভাবে খুব দ্রুত বসানো যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব। জোয়ার-ভাটা, কাদা ও ঋতু পরিবর্তনের মতো সুন্দরবনের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশে এটি ব্যবহারের দিক থেকে খুবই উপযোগী।

নাইলনের বেড়া দেওয়ার পর থেকে মানুষ-বাঘের কোনো সংঘাত হয়নি দাবি করে হাছানুর রহমান জানান, ২০১৮ সালে সর্বশেষ লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এরপর থেকে আর এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার বা মানুষের ওপর আক্রমণের পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঠেকানো অনেক বেশি কার্যকর। বাঘ সচরাচর যে পথ দিয়ে চলাচল করে, সেখানে বেড়া দিয়ে মানুষকে আলাদা করতে পারলে তা সুরক্ষার বাড়তি স্তর হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলেও কোনো ব্যাঘাত ঘটে না।

বিশেষ করে অস্থায়ী ক্যাম্প বা যেখানে বাওয়ালিরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, সেসব জায়গায় এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। বনের সীমানার কাছাকাছি মানুষের ঘুমানো, রান্না করা বা খাবার জমা রাখার কারণে এলাকাগুলো বাঘের আক্রমণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সুন্দরবন হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র। শীর্ষ শিকারি হিসেবে সুন্দরবনের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু একই সঙ্গে এই বন অনেক মানুষের জীবিকার সংস্থান করায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে পুরোপুরি আলাদা রাখা প্রায় অসম্ভব।

তাই নাইলনের বেড়াকে একক কোনো সমাধান হিসেবে না দেখে একটি বিস্তৃত কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা, বাউয়ালিদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি গ্রহণ, নিয়মিত টহল এবং বাঘের গতিবিধির বিষয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া।

চিরাচরিত দেয়াল তৈরি করা যেখানে অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল, সেখানে এই নাইলন জালের বহু ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করে সঠিক উপায়ে বেড়া স্থাপন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বনে আসা মানুষের সতর্ক আচরণের ওপর।

বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বাঘের জন্য এই নাইলনের বেড়া একটি মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে। বাঘ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী বেড়া দেখতে পেলে বনে ফিরে যায়।

তিনি আরও জানান, গত চার-পাঁচ বছরে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।

তবে পরিবেশবিদ ও সংরক্ষণকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, বেড়া এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে কোনো প্রাণী এতে আটকে না যায়, আঘাত না পায় বা তাদের স্বাভাবিক চলাচলে অহেতুক বাধা তৈরি না হয়। বাঘ কেবল এই বেড়া এড়িয়ে অন্য দিক দিয়ে লোকালয়ে আসছে নাকি প্রকৃতপক্ষে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা কমছে- তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের বাড়তি চাহিদা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে মানুষ ও বাঘের সহাবস্থান বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

যেহেতু স্থানীয় জনগোষ্ঠী জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল, তাই নাইলনের বেড়ার মতো কম খরচের প্রযুক্তি বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারে।

সংরক্ষণবিদদের মতে, এখান থেকে মূল শিক্ষণীয় বিষয় হলো—মানুষ রক্ষা আর বাঘ বাঁচানো দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। সুন্দরবনে সঠিক সীমানা নির্দেশক তৈরির মাধ্যমে উভয়ের নিরাপদে সহাবস্থান সম্ভব।

বন বিভাগ ইতোমধ্যে ধানসাগর, কৈখালী ও কৈলাশগঞ্জের মতো সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সফলভাবে অত্যন্ত শক্ত নাইলন জালের ৭৪ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ করেছে।

বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে।

উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ২০ বছরের ব্যবধানে (প্রায় ২০০০ সাল থেকে) মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্বে আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ এবং ৩৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সব মিলিয়ে মানুষের ওপর আক্রমণ ও সংঘাতের ১৭২ থেকে ৩২৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন