পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে ‘মাইট্রি অ্যাপ’ তৈরি করেছে আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের দাবি, এটি বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ডিজিটাল বৃক্ষ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম এবং জাতীয় বৃক্ষ তথ্যভাণ্ডার (ন্যাশনাল ট্রি ডাটাবেস) তৈরির একটি উদ্যোগ।
মাইট্রির মূল লক্ষ্য হলো বৃক্ষরোপণকে শুধু গাছ লাগানোর একটি কার্যক্রম হিসেবে না দেখে প্রতিটি গাছের জন্য আলাদা ডিজিটাল পরিচয়, ডিজিটাল তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা।
প্রতিটি গাছের থাকবে ডিজিটাল পরিচয়
মাইট্রি অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি রোপিত গাছের তথ্য ডিজিটালভাবে নিবন্ধন, সংরক্ষণ, যাচাই, মানচিত্রে চিহ্নিতকরণ ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। একটি গাছের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে ডিজিটাল ট্রি আইডি, কিউআর কোড, জিপিএস অবস্থান, গাছের প্রজাতি, রোপণের তারিখ, রোপণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, গাছের ছবি, পরিচর্যার তথ্য, বৃদ্ধির রেকর্ড, টিকে থাকার অবস্থা এবং পর্যবেক্ষণের ইতিহাস।
এর ফলে একটি গাছ শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে থাকবে না; বরং প্রতিটি গাছের জন্য তৈরি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রেকর্ড।
জাতীয় বৃক্ষ তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ
মাইট্রির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় রোপিত গাছের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে একটি জাতীয় বৃক্ষ তথ্যভাণ্ডারের ভিত্তি তৈরি করা। ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এনজিও, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের মাধ্যমে রোপণ করা গাছের তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এর মাধ্যমে কোথায় গাছ লাগানো হয়েছে, কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে, কখন লাগানো হয়েছে, কে বা কোন প্রতিষ্ঠান গাছটি লাগিয়েছে এবং বর্তমানে গাছটির অবস্থা কী—এসব তথ্য জানা সম্ভব হবে।
জাতীয় পর্যায়ে এমন একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে জেলা, উপজেলা, অঞ্চল ও প্রজাতিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করা সম্ভব হবে।
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে একটি বৃহৎ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছে ফাউন্ডেশন। এ ধরনের কর্মসূচিতে শুধু কতটি গাছ রোপণ করা হয়েছে, তার হিসাব রাখাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি গাছের অবস্থান, পরিচয়, তথ্য, পরিচর্যা, পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছটি টিকে আছে কি না—সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই লক্ষ্যেই মাইট্রি ‘গাছ নিবন্ধন, যাচাই, মানচিত্রে চিহ্নিতকরণ, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন’—এই সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরির ধারণা নিয়ে কাজ করছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে আরও তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এআই, জিআইএস, স্যাটেলাইট ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার
মাইট্রি অ্যাপের প্রযুক্তিগত কাঠামোয় বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এআইভিত্তিক গাছ যাচাই, কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ট্রি আইডি, জিপিএস ও জিআইএসের মাধ্যমে অবস্থান চিহ্নিতকরণ, স্যাটেলাইট ও এনডিভিআইয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ, ড্রোনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, গাছের টিকে থাকার অবস্থা অনুসরণ, ডিজিটাল ট্রি সার্টিফিকেট, ড্যাশবোর্ড ও তথ্য বিশ্লেষণ, কার্বন-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ ও কমিউনিটি সম্পৃক্ততা।
এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি গাছ রোপণের পর সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
কার্বন তথ্য ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানের সম্ভাবনা
মাইট্রির প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বনসৃজন, পুনর্বনায়ন ও পুনরুজ্জীবনমূলক কার্যক্রমের (অ্যাফরেস্টেশন, রিফরেস্টেশন অ্যান্ড রিভেজিটেশন—এআরআর) তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিশেষভাবে ভেরা ভিএম০০৪৭ এআরআর পদ্ধতির কাঠামো ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে বৃক্ষরোপণ ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের তথ্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা তৈরি করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে উপযুক্ত প্রকল্প কাঠামো, যাচাই এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে কার্বন হিসাবায়ন ও জলবায়ু অর্থায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রমে মাইট্রি তথ্য অবকাঠামো হিসেবে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
‘একটি গাছ, একটি ডিজিটাল পরিচয়’
মাইট্রির মূল দর্শন—‘একটি গাছ, একটি ডিজিটাল পরিচয়’ এবং ‘প্রতিটি বৃক্ষরোপণের একটি ডিজিটাল রেকর্ড’।
অর্থাৎ শুধু কতটি গাছ লাগানো হয়েছে—এই হিসাবের মধ্যে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ না রেখে কোথায়, কোন প্রজাতির গাছ, কে লাগিয়েছে, কখন লাগিয়েছে, গাছটি বর্তমানে কোথায় আছে এবং সময়ের সঙ্গে তার কী পরিবর্তন হচ্ছে—এসব তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রভাব
ফাউন্ডেশনের মতে, জাতীয় পর্যায়ে মাইট্রি বাস্তবায়িত হলে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো সম্ভব হবে। বৃক্ষরোপণের তথ্য ও অবস্থান ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। রোপণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং প্রতিটি গাছের আলাদা রেকর্ড রাখা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যা নয়, গাছের টিকে থাকার অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা যাবে। দেশের বৃক্ষসম্পদ সম্পর্কিত একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরির ভিত্তি তৈরি হবে। অঞ্চল ও প্রজাতিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনায় সহায়তা পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থী, নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সামাজিক সংগঠনকে বৃক্ষরোপণ ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাইট্রি অ্যাপ’ উপহার দিতে চায় ফাউন্ডেশন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফাউন্ডেশন ‘মাইট্রি অ্যাপ’ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার হিসেবে দিতে আগ্রহী।
ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য হলো সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা, এনজিও, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল বৃক্ষ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘গাছ লাগানো একটি মহৎ উদ্যোগ, কিন্তু গাছকে বাঁচিয়ে রাখা আরও বড় দায়িত্ব। মাইট্রি অ্যাপের মাধ্যমে আমরা প্রতিটি গাছের একটি ডিজিটাল ইতিহাস তৈরি করতে চাই—যাতে বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুধু সংখ্যার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, পরিচর্যা, জবাবদিহিতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে।’
আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফাউন্ডেশন মনে করে, মাইট্রি শুধু একটি অ্যাপ নয়; এটি বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


