প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে মুক্ত হয়ে একটি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চান বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ শিবলী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের ভয় ও অন্ধকারের শাসন থেকে বাংলাদেশ আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবিকতাকে দুর্বলতা মনে করে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা না করেন।
বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক জাতিসংঘ সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সালেহ শিবলী বলেন, সফরটি শুধু একটি রুটিন সফর বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতিসংঘের মূল অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি ছয় দিনের সফরের কার্যকর চার দিনে প্রধানমন্ত্রী একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও সাইডলাইন বৈঠকসহ অন্তত ৩০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন। এসব কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা মিশন, জ্বালানি সংকটসহ বাংলাদেশের ও বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলেছেন তিনি।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে তার বক্তব্যের শুরুতেই কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে নিজের বাবা-মায়ের কথা স্মরণ করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাদের স্মরণ করেছেন। যে মঞ্চে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শুধু বাংলাদেশের বিষয় তুলে ধরেননি; বিশ্বে চলমান বিভিন্ন সংকট ও মানবতার পক্ষেও কথা বলেছেন। বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংঘটিত ঘটনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব সবার ওপর পড়ে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের কী ভূমিকা নেওয়া উচিত এবং জাতিসংঘের ভূমিকা কেমন হওয়া দরকার— প্রধানমন্ত্রী সে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে সালেহ শিবলী বলেন, ‘মরণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তিতর্ক, শিক্ষা ও মানবতাই হোক প্রধান হাতিয়ার।’ কোনো রাষ্ট্রের পরিবর্তনের জন্য মরণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, তর্ক, শিক্ষা ও মানবতাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী।
প্রেস সচিব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্রই শক্তিশালী হতে পারে না। এই বক্তব্য শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও জাতিসংঘে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশকে নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে।
সালেহ শিবলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেছেন এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে ও নির্দ্বিধায় নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তার সব সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে। সর্বোপরি জনগণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ছয় দিনের সফরের প্রথম ও শেষ দিনের যাতায়াতের সময় বাদ দিলে কার্যকর সময় ছিল চার দিন। এই চার দিনে তিনি অন্তত ৩০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন। প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো না কোনো বিষয় তুলে ধরেছেন। ফলে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল না; বক্তব্যের বিষয়গুলো বিভিন্ন বৈঠক ও কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বপরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, শুধু প্রধানমন্ত্রীই নয়, তার সফরসঙ্গী মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিনিধিরাও অন্তত ৫০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সম্ভব হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সফরে ব্যয় সংকোচনের বিষয়টি তুলে ধরে সালেহ শিবলী বলেন, প্রচলিত রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করার চেষ্টা প্রথম দিন থেকেই করছেন প্রধানমন্ত্রী। এবার জাতিসংঘ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলেন মাত্র ৩৫ জন। অথচ অতীতে বাংলাদেশ থেকে বিশেষ বা চার্টার্ড বিমানে ২৯২ জন সফরসঙ্গী নিয়ে জাতিসংঘে প্রতিনিধি দল যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ওই ২৯২ জনের সফরের ব্যয় কার? সেটি দেশের জনগণের, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ। কিন্তু সেখানে জবাবদিহিতা ছিল না।
তিনি বলেন, এবার প্রধানমন্ত্রী চার্টার্ড বিমানে যাননি; সাধারণ যাত্রীর মতোই সফর করেছেন। তার সফরসঙ্গীরাও একইভাবে যাতায়াত করেছেন।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সালেহ শিবলী বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরে গুম, খুন, অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ, হামলা, মামলা ও হয়রানির মধ্য দিয়ে একটি ভয় ও আতঙ্কের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি যারা টেলিভিশনে টকশো করতেন, তারাও অনুষ্ঠান শেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, কিংবা ফোন পেয়ে কেউ তাদের তুলে নিয়ে যাবে কি না— এ ধরনের আশঙ্কায় থাকতেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এখন সেই পরিস্থিতি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি ফ্যাসিবাদী সরকার এক দিনে তৈরি হয়নি; ১৫ বছর সময় লেগেছে। একইভাবে এমন একটি ঘোর অন্ধকার পরিবেশ থেকে বাংলাদেশ যখন আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে, তখন গণতন্ত্রের পক্ষের সবাইকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত হয়ে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে চান। এ কারণে সরকারের পাশে থেকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে একজন রাজনীতিককে যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, প্রধানমন্ত্রী তার প্রায় সবকিছুর মধ্য দিয়েই গেছেন। তার বিরুদ্ধে শত শত মামলা হয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, রিমান্ডে যেতে হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, দেশত্যাগ করতে হয়েছে। তার বক্তব্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যে বাড়িতে তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেই স্মৃতিময় বাড়িও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সালেহ শিবলী বলেন, ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বিএনপি যে বিশ্বাস ধারণ করে— জনগণই বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস— সেই জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন যারা দীর্ঘদিন কথা বলতে পারেননি, তারা অন্ধকারের শাসন থেকে বেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবিকতার রাজনীতি করছেন এবং মানবিকভাবে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করছেন। এই পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবিকতাকে দুর্বলতা মনে করে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা না করেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘সুবর্ণ সময়’। কেউ যদি এ সময়ের অপব্যবহার করেন কিংবা রাষ্ট্র ও সমাজে মানবিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা এবং সুন্দর একটি রাষ্ট্র গঠনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন, তাহলে সেটি কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনবে না।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের ৩০টি ইভেন্টে তার অংশগ্রহণ, বিভিন্ন বৈঠক ও কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য এবং সফরসঙ্গী মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের অর্ধশতাধিক কর্মসূচির বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


