কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না নতুন মাদকের বিস্তার

স্টাফ রিপোর্টার

কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না নতুন মাদকের বিস্তার

সারা দেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার হয়েছে। সর্বনাশা মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত তরুণ ও যুবসমাজ। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন শিক্ষার্থীরাও মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছে। এতে তাদের মধ্যে অসংলগ্ন ব্যবহার, ভুলে যাওয়া, দুর্বলচিত্ততা ও হতাশা দেখা দিচ্ছের‌্যখন গ্রামাঞ্চলেও হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ছাড়াও নতুন মাদকের ছড়াছড়ি সর্বত্রই। মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ও পুলিশ জিরো টলারেন্স ঘোষণা করলেও কোনো কাজে আসছে না।

এছাড়াও দিন দিন নতুন নতুন মাদকের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। নতুন মাদকের মধ্যে থাইল্যান্ডের কুশের চাহিদা এখন শীর্ষে। অভিজাত পরিবারের সন্তানরাও এই মাদকে আসক্ত। এছাড়া সিসার চাহিদাও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে আজ শুক্রবার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। এ উপলক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বেশকিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের সমন্বয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ব্যর‌্যতা ও হতাশা, গণবেকারত্ব, ফ্যাশন, সঙ্গদোষ, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা, আনন্দদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি, দরিদ্রতা, নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতার কারণে বার‌্য মাদক সেবন।

এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞর‌্য. রাশিদুল হক বলেন, মাদক যুবসমাজকে শেষ করে দিচ্ছে। এটা মস্তিষ্ককে দুর্বল করে দেয়। এর প্রতিকারে সামাজিক আন্দোলন দরকার।

পুলিশ জানায়, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে নতুন নতুন মাদক প্রবেশ করছে দেশে। স্থল সীমান্ত, নৌ ও আকাশপথে চোরাকারবারিরা এই মাদক নিয়ে আসছে। মাদকের ব্যাপারর‌্যরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে তা আগের তুলনায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাতদিন মাদক দমনে কাজ করছে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও মাদকের অফার দিচ্ছে মাদক কারবারিরা। তারা ইনবক্স করে মাদক বিক্রির অফার দিচ্ছে। যারা মাদক থেকে মুক্ত হতে চান, তারা নিজের‌্যঅথবা তাদের পরিবার মাদকাসক্তদের সরকারি ও বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে থাকেন। দেশে বছরে কতজন সরকারি ও বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন, র‌্য কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। এসব রোগীকে একটি ডেটাবেজের আওতায় নিয়ে আসতে চায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। যাতে তাদের পরে চিহ্নিত করে আরো ভালো চিকিৎসা দেওয়া যায়।

ডেটাবেজের আওতায় আসছে মাদকাসক্তরা

মাদকাসক্তদের চিকিৎসর‌্যপর সহজেই ট্র্যাকিং এবং কেস হিস্ট্রি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য ডেটাবেজের উদ্যোগ নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ডেটাবেজে একজন মাদকসেবী কী ধরনের মাদক সেবন করে মাদকাসক্ত হয়েছে, কখন থেকে মাদক সেবন শুরু করেছিল, কতটুকু সেবন করত, মাদক সেবনের দায়ে কারাগারে গিয়েছিল কী-না; কারো প্ররোচনায়, না নিজের আগ্রহে মাদকাসক্ত হয়েছে, কখনো নেশা ছেড়েছিল কী না, তার পরিবার নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, না বিত্তশালী এবং বর্তমানে তার শারীরিক-মানসিক অবস্থা কেমনÑতা অন্তর্ভুক্ত হবে। যারা সরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র এবং সরকার অনুমোদিত বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেবে, তারা এ ডেটাবেজের আওতায় আসবে। এতে একজন মাদকাসক্ত পুনরায় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এলে সহজেই তাকে কর্তৃপক্ষ ডেটাবেজ থেকে দ্রুত চিহ্নিত করে তার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে।

ডিএনসিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে

(ডিএনসি) ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এ অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিশ্বমানের ইন্টারোগেশন ইউনিট স্থাপন, ক্রিমিনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু, উন্নত গোয়েন্দা যন্ত্রপাতি ক্রয়, ডিজিটাল ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে মাদক দমন সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা ও উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে মাদক সেবন। ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে।

চৌদ্দগ্রামের সাত ইউনিয়নের ৪৪ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা। অপরদিকে সীমান্তের ১৫০-৫০০ গজের মধ্যে দেশের ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয়রা মাদকসহ বিভিন্ন দ্রব্য পাচার করে থাকে। বিনিময়ে তারা নিয়ে যায় বাংলাদেশের মাছ ও আলুসহ বিভিন্ন মূল্যবান পণ্যসামগ্রী। এজন্য রাতের বেলায় চৌদ্দগ্রামের ৪৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা চোরকারবারিদের দখলে থাকে। অভিযোগ উঠেছে, চোরাকারবারিরা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) ভুয়া তথ্য দিয়ে অন্য স্পটে রেখে অনায়াসে পাচারকাজ চালায়।

স্থানীয়রা জানান, ২১ বছর আগে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। তখনও বাংলাদেশের ট্রাক ভারতের ভেতরে ঢুকে মাদকদ্রব্যসহ বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য নিয়ে আসত। এখন আর ট্রাক যেতে না পারলেও মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য পণ্য আদান-প্রদানের ঘটনা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর অর্ধশতাধিক সংঘবদ্ধ চক্র মাদক কারবার ও পাচার‌কাজে জড়িত। দুই দেশের সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের পাহারা থাকলেও রহস্যজনক কারণে ভারত থেকে অবাধে আসছে ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদব্য। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের দেখা দিয়েছে।

এছাড়াও দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় চলছে মাদকের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে মাদক কারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কৌশলে আরো গভীরে শিকড় গেড়ে বসছে এসব চক্র।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা গ্রাহকদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। এতে অভিযান চালিয়েও অনেক সময় মূল কারবারিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের খোলামেলা পরিবেশ ও স্থানীয় সোর্স ব্যবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির খবর আগেই পেয়ে যায় চক্রগুলো। ফলে সহজেই মাদক সরিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) ও খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন