মিরাজ গুমের তদন্ত চায় আসক, অভিযোগ অস্বীকার কোস্টগার্ডের

মিরাজ গুমের তদন্ত চায় আসক, অভিযোগ অস্বীকার কোস্টগার্ডের

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখকে (৩০) গুমের যে অভিযোগ উঠেছে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে তার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে আসক।

বুধবার আসকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, তারা মিরাজকে আটক করেনি।

বিজ্ঞাপন

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ১৬ ও ১৭ মে সরেজমিনে প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান জানতে পারে যে, বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকায় স্থানীয় জেলে ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক মিরাজ শেখকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সদস্যরা জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে। আসকের সদস্যরা ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সাংবাদিক, পুলিশ ও কোস্ট গার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করে। পরবর্তী সময়েও আসক ঘটনাটির অনুসরণ অব্যাহত রেখেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে সাদা পোশাকে থাকা কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি জয়মনির ঘোল এলাকার আল আমিনের চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজ শেখকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পরে তাকে কোস্ট গার্ডের একটি স্পিডবোটে তোলা হয়, যেখানে পোশাক পরিহিত আরও ৭-৮ জন কোস্ট গার্ড সদস্য অবস্থান করছিলেন। ভুক্তভোগীর স্ত্রীও দাবি করেছেন যে, তিনি হারবারিয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনের পন্টুনে নিজের চোখে তার স্বামীকে কোস্ট গার্ড সদস্যদের হেফাজতে দেখতে পান এবং পরে তাকে স্পিডবোটে করে নিয়ে যেতে দেখেন। ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত মিরাজ শেখের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের অভিযোগ, তাকে কোনো আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি, পুলিশের কাছেও সোপর্দ করা হয়নি এবং তাঁর অবস্থান সম্পর্কেও পরিবারকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

অন্যদিকে, কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মিরাজ শেখকে আটক বা হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। মোংলা থানার তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের হলেও কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মিরাজ শেখকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিষয়ে থানাকে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, ১০ এপ্রিলের ঘটনার পর একাধিকবার থানায় গেলেও সাধারণ ডায়েরি গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কোস্ট গার্ডের নাম উল্লেখ না করে একটি সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্ত করা হয়। পরিবারের দাবি, থানার নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিতে উল্লেখ করা হয় যে মিরাজ শেখ নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন; এবং কোস্ট গার্ড কর্তৃক তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগটি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করতে দেয়া হয়নি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) প্রতিনিধি দল দিগরাজ কোস্ট গার্ড বেইজে গিয়ে কোস্ট গার্ডের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তিনি মিরাজ শেখকে আটক বা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং জানান, এ ধরনের কোনো ব্যক্তি কোস্ট গার্ডের হেফাজতে নেই। তার ভাষ্যমতে, জয়মনির ঘোল এলাকা পূর্বে দুষ্কৃতকারীদের ঘাঁটি ছিল এবং সেখানে কোস্ট গার্ডের কার্যক্রমে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ অভিযোগ তুলেছে। হারবারিয়া স্টেশনের পন্টুনে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে কিনা- এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান। একই সঙ্গে তিনি মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যদের দিগরাজ কোস্ট গার্ড বেইজে যাওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে, মিরাজ শেখের স্ত্রী দাবি করেছেন যে, ঘটনার রাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. নাজমুলের মাধ্যমে কোস্ট গার্ড স্টেশনের ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সন্দেহজনকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিরাজ শেখকে নেওয়া হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তথ্যানুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, ভুক্তভোগীর পরিবার ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারাবাহিক বক্তব্য এবং কোস্ট গার্ডের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতির মধ্যে বিদ্যমান স্পষ্ট অসঙ্গতি একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) অবিলম্বে মিরাজ শেখের অবস্থান নির্ণয়, তার পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে।

বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হলে কোস্টগার্ডের সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়ামুল হক আমার দেশকে জানান, মেরাজকে কোস্টগার্ড আটক করেনি। উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রপাগান্ডা ছাড়ানো হচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন