দেড় বছর আগে নিবন্ধনের মেয়াদ ফুরিয়েছে রাজধানীর পরিবাগে অবস্থিত লিবার্টি হাসপাতালের। নেই পরিবেশ ছাড়পত্রও। আছে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও। তারপরও চলছে হাসপাতালটি। অবৈধ এ হাসপাতালে যারা সেবা দিচ্ছেন তারা ছিলেন জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) হামলার ঘটনার মূলহোতা। তাদের ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত লোকজন জানান, মালিকানায় না থাকলেও আওয়ামী লীগের পদধারী চিকিৎসক নেতারা হাসপাতালটি জবর-দখল করে বসে আছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে প্রায় ১২শ’ অস্ত্রোপচার এবং পাঁচ থেকে ছয় হাজার রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন। এতে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা আয় হলেও সরকারকে রাজস্ব হিসেবে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের নিবন্ধনের জন্য কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে সবকিছু করা হচ্ছে। এতে সিন্ডিকেটের পকেটে মুনাফা ঢুকলেও মালিকানায় থাকা বিনিয়োগকারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এসব ঘটনায় হাসপাতালটির পরিচালক জাহিদুল ইসলাম উচ্চ আদালতে মামলা করেছেন। একই সঙ্গে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অফিস অব দ্য রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
দেড় বছর আগে শেষ হয়েছে নিবন্ধনের মেয়াদ
২০২৪ সালে সেবা কার্যক্রম শুরু করে লিবার্টি হাসপাতাল। হাসপাতালের পাশাপাশি নিবন্ধন করা হয়েছিল ডায়াগনস্টিক সেন্টারেরও। চালুর শুরুতে নিবন্ধন করলেও ওই বছরের জুনে মেয়াদ শেষ হয়। দেড় বছর আগে দুটোরই মেয়াদ ফুরালেও এখন পর্যন্ত নতুন করে নবায়ন করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
শুধু নিবন্ধন নয়, পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব ঘটনায় ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর হাসপাতালটিকে জরিমানার পাশাপাশি পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।
জুলাইয়ে বিএমইউতে হামলার মূলহোতারা দিচ্ছেন চিকিৎসা
জুলাই বিপ্লবের শেষদিকে ৪ আগস্ট শাহবাগ মোড়ে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি পালনকালে তাদের ওপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে। সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাখা হাসপাতাল ও সাধারণ মানুষের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসক ৩৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বহিষ্কার করা হয়।
জানা গেছে, বহিষ্কারের তালিকায় থাকা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক সহকারী প্রক্টর ও ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নাজির উদ্দিন মোল্লাহ। লিবার্টি হাসপাতালে নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু নাজির উদ্দিন নন, হামলায় জড়িত ছিলেন ইউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারুক হোসেন মুন্সী, নিউরো সার্জন ডা. ফরিদ রায়হান, মেডিকেল অফিসার ডা. শরিফ উদ্দিন সিদ্দিকী। প্রত্যেকেই ওই হামলার ঘটনায় বহিষ্কৃত ও আওয়ামীপন্থি চিকিৎসক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে হাসপাতালটির সেবা চালু করতে ব্যয় হয় ১০ কোটি টাকা। ২৫ জন পরিচালকের বাইরেও আরো ২০ জনের শেয়ার রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। এর মধ্যে এক-শতাংশের শেয়ার দিয়েও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে বসেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম চৌধুরী। হাসিনা সরকারের পতন হলে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। তার জায়গায় হাসপাতালের পরিচালকদের মধ্য থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার কথা থাকলেও সে দায়িত্ব মালিকানাহীন আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পান বিএমইউ জেনারেল সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক শেখ মুজাম্মেল হক। অভিযোগ রয়েছে, কাগজপত্র ছাড়া রেজুলেশন জালিয়াতি করে অবৈধভাবে এই পদে বসেন তিনি।
লিবার্টি হাসপাতালের অন্তত পাঁচজন পরিচালক অভিযোগ করেছেন, হাসপাতাল দখলের পাশাপাশি বিএমইউ থেকে বিতাড়িত আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব ডা. মুজাম্মেলের।
লিবার্টি হাসপাতালের পরিচালক জাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ২০২২ সালে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক থেকে নিবন্ধন নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। হাসপাতালের শুরু থেকে কেনাকাটাসহ নানা দুর্নীতির কারণে একাধিকবার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে পতিত আওয়ামী লীগের কিছু দুষ্কৃতকারী বাধ্যতামূলক ৮টা লাইসেন্স ছাড়াই হাসপাতালটি দখল করে পরিচালনা করছে। এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট হাসপাতাল চালু হবার আগে কেনাকাটায় দুর্নীতি করেই প্রায় ৯০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং চালু হবার পর গত প্রায় ১৮ মাস ধরে প্রায় ২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন, কিন্তু এর দায় চাপিয়েছেন হাসপাতালের ওপর।
তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর হাসপাতাল বন্ধের আদেশ দিয়েছে ১ বছর আগে। তবে তা না করে উল্টো অ্যাটমিক এনার্জি, নারকোটিক লাইসেন্স ছাড়াই এক হাজার ২০০ অপারেশন এবং ২০ হাজার রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকসহ গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যতামূলক লাইসেন্সগুলোও মেয়াদোত্তীর্ণ।
জানতে চাইলে লিবার্টি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. শেখ মুজাম্মেল হক আমার দেশকে বলেন, হাসপাতালটি চালুর পর নিবন্ধন হলেও নানা জটিলতায় সেটি নবায়ন করা হয়নি। অনেক সনদই ছিল না। আমি বছরখানেক হয় দায়িত্ব নিয়েছি। ইতোমধ্যে কয়েকটি করা হয়েছে, বাকিগুলো করার চেষ্টা চলছে।
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি হাসপাতাল, এখানে বিএনপি মানসিকতার চিকিৎসক যেমন আছে, আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকরাও আছেন। আমরা কাউকে পুনর্বাসন করছি না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, নিবন্ধনের মেয়াদ ফুরালে নবায়ন করতে হয়। এটি কেন করল না, বিষয়টি তদন্ত করা হবে। আর পরিবেশ অধিদপ্তর যেখানে জরিমানা ও বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে, সেখানে কীভাবে হাসপাতালটি চলছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। এক ঘটনায় দুই প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিতে পারে না। সে অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরেরই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

