তীব্র দূষণ ও বন্যার কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নগরীর পানি নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনে মিঠাপানির পরিমাণও কমছে। শিল্প, সেচ ও গৃহস্থালির উদ্দেশ্যে অস্থিতিশীল ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন দেশের পানিস্তরের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ভূগর্ভস্থ পানিস্তর গত ৩০ বছরে গড়ে ২.৩ মিটার থেকে ১১.৫ মিটার পর্যন্ত কমেছে। আর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও শঙ্কার পর্যায়ে। দেশের বিভিন্ন শহরে থাকা ৭১ শতাংশ মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার বাইরে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ঢাকার নদীদূষণের ফলে প্রতি বছর প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়। টাকার অঙ্কে (প্রতি ডলার ১২০ টাকা ধরে) যা প্রায় ৩০ হাজার কোটি।
বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে (যেমন ঢাকা ও চট্টগ্রাম) বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলো অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন, বিপজ্জনক রাসায়নিক ও ভারী ধাতুযুক্ত শিল্পবর্জ্য নির্গমনের মাধ্যমে জলপথ দূষিত করছে। প্রতিদিন নগরীর প্রায় এক হাজার ৫০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য এবং দুই হাজার ৪০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ঢাকা মহানগরীর আশপাশের নদী ও খালে ফেলা হয়। ঢাকা মহানগরী অঞ্চলে উৎপাদিত মোট কঠিন বর্জ্যের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ (প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টন) সরাসরি নদী ও খালে ফেলা হয়।
অপরিশোধিত গৃহস্থালির পয়োবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য ফেলার মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ফলে ঢাকাসহ অন্যান্য প্রধান শহরের আশপাশের নদী ও জলাশয়ের দূষণ বাড়ছে। নদী ও খালগুলো এখন প্রবাহ হ্রাস, পলি জমা, দখল, নাব্য কমে যাওয়া ও ব্যাপক দূষণের শিকার হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে।
জানতে চাইলে বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবেদ হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘আমাদের দেশের নগরায়ণ কখনোই পরিকল্পিত ছিল না। অনেকটা চাপে বা রাজনৈতিক কারণে শহরগুলোর বাউন্ডারি বাড়ে।’ স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখানে সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও দায় আছে। তারা যে ধরনের নগরায়ণ চায়, সেভাবে ট্যাক্সেশন করে না। ফলে পরিকল্পনায় কোনো ফান্ড এলে উন্নয়ন হয়, নতুবা হয় না। ঢাকা শহরে সিটি করপোরেশনের বাউন্ডারি বেড়েছে। আবার ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে টানাটানির ব্যাপারও আছে। কিছু সুবিধা দিচ্ছে এলজিইডি, কিছু দিচ্ছে পৌরসভা। তবে কে কোনটা করছে, সেটা নিয়েই দ্বিধা থাকে।
গভীর কূপের পানির ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়তই, তবে সব শহরে একরকম না। আমরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সেখানে নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আর যেসব জায়গায় অনেক বেশি নেমে যাচ্ছে, সেখানে কৃত্রিম ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবস্থাপনা জোরদারের পরামর্শ দিয়ে এ বিশ্লেষক বলেন, পানি ব্যবহারে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং অন্য উৎসের পানি ব্যবহারে জোর দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যাপক পানিদূষণের ফলে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ বেসরকারি পাইপযুক্ত পানির কলে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ ‘উন্নত’ পানীর উৎসে (প্রাথমিকভাবে অগভীর নলকূপ) আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ পানি নির্দেশিকা (প্রতি বিলিয়নে ১০ শতাংশ) অনুসারে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে।
ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ বলেন, ই-কোলাই সাধারণত পানির উৎস থেকে আসে। পাইপে যদি লিক থাকে অথবা চাপ কম থাকে, তখন এগুলো বাড়তে থাকে। সবকিছুই ব্যবস্থাপনার অংশ। ব্যবস্থাপনায় কোয়ান্টিটি ও কোয়ালিটি যদি ঠিক থাকে, তাহলে এসব থেকে ঝুঁকিও কমানো যাবে।
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান দূষণ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। জলবায়ু পরিবর্তন, যেমন স্বল্পসময়ের জন্য তীব্র বৃষ্টি, দেশের বিভিন্ন অংশে (দেশের ২০-৬৭ শতাংশ এলাকা) বন্যা, ভূমিক্ষয় ও ঝোড়োহাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা কিছু প্রধান শহর ও উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রভাবিত করছে। বন্যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং অপর্যাপ্ত বৃষ্টি, পানি নিষ্কাশন, দুর্বল কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ, দখল ও পলি জমে নদী-খালগুলোতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে আরও জটিল হয়ে উঠছে।
নদীতীরে অনিয়ন্ত্রিত প্রকল্প উন্নয়ন ঢাকার প্রায় ৫০ শতাংশ জলাভূমি ও নিষ্কাশন খাল ধ্বংস করেছে বলে অভিযোগ করা হয় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটিতে। নদীতীরে এসব অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের কারণে বন্যা সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম শহর এলাকা। গভীরতার দিক থেকে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রামে বন্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
চট্টগ্রামের পরিবেশ দূষণের চিত্র তুলে ধরে তারা বলছে, অন্যান্য উপকূলীয় শহরের সঙ্গে চট্টগ্রামও লবণাক্ততা অনুপ্রবেশের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানি বা সুপেয় পানি সরবরাহকে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে। তাই পানির সঠিক মান নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত শোধন ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয় চট্টগ্রামে। এই পুনরাবৃত্ত দুর্যোগগুলোর কারণে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, পরিষেবা ব্যাহত করতে পারে এবং পানির গুণগত মানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এর ফলে স্বাস্থ্যের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়তে পারে।
দুই প্রধান সমস্যা নগরায়ণে
নগর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দুটি প্রধান বাধা হলো সীমিত উৎস ও নিম্নমানের সেবা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ৬ কোটি ৭০ লাখ নগরবাসীর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ (৪৬ শতাংশ) নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত এবং ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ (৭১ শতাংশ) নিরাপদে স্যানিটেশন ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত। নগর জনসংখ্যার মাত্র একটি ছোট অংশ (৩৩ শতাংশ) পাইপযুক্ত পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন পরিষেবার সুযোগ পায়। দ্রুত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে পরিষেবা ব্যবস্থা এবং সেবার মানে ঘাটতি আরও বেড়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

