বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলো আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে।
বাস ও ট্রেনে আগুন দেওয়া এবং ককটেল বিস্ফোরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনা কারা ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার দাবি, ‘পতিত স্বৈরাচারদের’ পাশাপাশি আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসীদের বক্তব্যও আসছে। এমনকি বিরোধী দলের মধ্য থেকেই হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট এ সভার আয়োজন করে।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে হামলার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, গত রোববার রাতে গুপ্ত বলে পরিচিত একটি সংগঠনের ছাত্র সংগঠন সেখানে তাণ্ডব চালিয়েছে। তারা ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করেছে। এর দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আপনারা পারলে পরিকল্পিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি লংমার্চ করে দেখান।’
জামায়াতের উদ্দেশে রিজভী বলেন, দলটি দুটি নীতি নিয়েছে। একটি হলো মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিরোধী বক্তব্য দেওয়া; অন্যদিকে নিজেদের ‘সোনালি বা রুপালি রঙের ছেলেদের’ উসকে দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো। তার অভিযোগ, জামায়াত দেশের সব রাজনৈতিক বিকাশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
রিজভী বলেন, পাকিস্তান আন্দোলনের সময় এ দেশের সব জনগোষ্ঠী যখন এক হয়েছিল, তখনো তারা সেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে তারা বাধা দিয়েছে। জনগণের পক্ষে তাদের কখনো কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে ইসলামের নাম ব্যবহার করে তারা জনগণের সঙ্গে বারবার প্রতারণা করেছে। এ কারণে তারা কোনো দিন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির এই নেতা বলেন, একটি ন্যায্য সরকারি কার্যক্রম বা পরিচালনাকে অপপ্রচারের ঘেরাটোপ দিয়ে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তার দাবি, এখনো কেউ বলতে পারবে না যে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে টাকা পাচার হচ্ছে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লুটপাট হচ্ছে। দেশের আর্থিক খাত ও ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড আবার পায়ে মাটি পাচ্ছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আড়াই গুণ বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু রাজনৈতিক দলের সুর এখন কিছুটা ভিন্ন দেখাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন রিজভী। বিরোধী দলগুলোর সাম্প্রতিক লংমার্চ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতির প্রতিবাদসহ জনস্বার্থে কয়েকটি দাবি নিয়ে চট্টগ্রাম ও রংপুরে লংমার্চ করা ভালো। কিন্তু জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে রংপুরে সংগঠন থাকা সত্ত্বেও কেন ৪৫০টি গাড়ি নিয়ে যেতে হলো, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
রিজভী বলেন, জ্বালানি সংকটের সময়ে ৪৫০টি গাড়িতে জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন ছিল কি না, সেটিও ভাবা দরকার। তার ভাষায়, ওই জ্বালানি না পুড়লে অনেক সাশ্রয় হতো। এখন জাতীয় গ্রিডে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কম। এই জ্বালানি ভালো কাজে ব্যবহার করা যেত।
রিজভীর দাবি, তিনি বানিয়ে বলছেন না। যমুনা ব্রিজের টোলের হিসাব অনুযায়ী ৪৫০টি গাড়ি গেছে। অথচ লংমার্চে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরাই ১ হাজার গাড়ি নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে কিছু গাড়ির টোলও হয়তো দেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। সমসাময়িক প্রতিবেদনে যমুনা সেতুর টোল প্লাজা সূত্রের বরাত দিয়ে লংমার্চের প্রায় ৪৩০ থেকে ৪৫০টি গাড়ি সেতু পার হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
বিরোধী দলের উদ্দেশে রিজভী আরও বলেন, বৈশ্বিক সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে জঘন্য অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এই সংকটের সঙ্গে সরকার, বিরোধী দল কিংবা দেশের মানুষের কোনো হাত নেই। সংকটটি বাংলাদেশের অনেক দূরে। অথচ সেটি সরাসরি সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র আছে বলেই বিরোধী দল সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে কথা বলতে পারে। তারা জোরালো সমালোচনাও করতে পারে। বিরোধী দল লংমার্চ করেছে। কিন্তু সরকার বা সরকারের পক্ষের দল কোথাও বিন্দুমাত্র বাধা দেয়নি।
রিজভী বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করেছিলাম শেখ হাসিনার অসভ্যতা, কাদা ছোড়াছুড়ি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। কিন্তু এখন আবার তার পুনরাবৃত্তি দেখছি। এর জন্যই কি আবু সাঈদসহ এত মানুষের আত্মদান?’
তিনি আরও বলেন, ‘এই স্বাধীন দেশেই এমন একটি রাজনৈতিক দল ছিল—যারা পাঞ্জাবি, বালুচ, ব্রিটিশ বা স্কটিশ নয়—তারাই আমাদের ওপর এ ধরনের বর্বর আচরণ করেছে। এই গোষ্ঠী অতীতে আমাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার নিপীড়ন আমার কাছে কোনো কোনো সময় তাদের চেয়েও বেশি এবং ভয়াবহ মনে হয়েছে।’
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) সভাপতি ব্যারিস্টার নাসিম খানের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খান, গণদলের চেয়ারম্যান এ টি এম গোলাম মওলা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ-আল-হারুন (সোহেল), ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন চন্দ্র দাস, সাম্যবাদী দলের সভাপতি সাইদ আহমেদ, বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বারেক, এনডিপির মহাসচিব জামিল আহমেদ, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির মহাসচিব সাইফুল ইসলাম, বিএমএলের মহাসচিব রেজওয়ান মর্তুজা ও গণদলের মহাসচিব আবু সৈয়দ।
জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত সভাটি সঞ্চালনা করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


