আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হ্যাঁ ভোট নিয়ে বিভ্রান্তিতে বিএনপির তৃণমূল, সমর্থন জামায়াত-এনসিপির

রকীবুল হক, মাহফুজ সাদি ও জাহিদুল ইসলাম

হ্যাঁ ভোট নিয়ে বিভ্রান্তিতে বিএনপির তৃণমূল, সমর্থন জামায়াত-এনসিপির

বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিনে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। তবে মাঠে দুই ভোটের প্রচারে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে।

সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর জোরালো প্রচারের বিপরীতে গণভোট অনেক দলের কাছেই যেন উপেক্ষিত। বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আনুষ্ঠানিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও প্রচারের ক্ষেত্রে বিএনপির নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিপরীতে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট গণভোটকে সামনে রেখে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকার ঘোষণা দেওয়ার পরও কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা পড়েছেন বিভ্রান্তিতে। সংসদ সদস্য প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’Ñকোন অবস্থান নেবেন, তা স্পষ্ট করতে না পারায় ভোটারদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক নেতা।

বিএনপির কয়েকজন তৃণমূল নেতা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা না পেলেও ভোটাররা জানতে চাইলে তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই কথা বলছেন। তবে অনেক এলাকায় কেবল ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়া হচ্ছে, গণভোটের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে গণভোট নিয়ে জোরালো প্রচারে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। প্রতিটি নির্বাচনি সভায় তারা সংসদ নির্বাচনের প্রচারের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাচ্ছে। জোটের অনেক প্রার্থী তাদের ব্যানার-লিফলেটে গণভোটের কথাও লিখেছেন। তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে অনুরোধ করেছেন।

এদিকে, গণভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। গণভোটের পক্ষে সচেতনতা বাড়াতে সরকারের উপদেষ্টারা সারা দেশ সফর করছেন। সরকারের সব দপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে। সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক ও তথ্য মন্ত্রণালয় গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোটারদের সচেতন করতে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চালানো হচ্ছে প্রচার। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ প্রণয়ন করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ওই সনদ বাস্তবায়নে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করে। ওই অধ্যাদেশের আলোকে গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গণভোটেরও তফসিল ঘোষণা হয়। তফসিল অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট হবে। সংসদ নির্বাচনের ভোটাররাই গণভোটের ভোটার হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

তফসিল ঘোষণার পর সংসদ নির্বাচনের প্রচারে বিধিনিষেধ থাকলেও গণভোটের প্রচারে আইনত কোনো বাধা ছিল না। এ সময় জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালালেও নীরব দেখা গেছে বিএনপিকে। গত ২২ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো তাদের দলীয় প্রতীকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালানো শুরু করে। তবে গণভোট প্রশ্নে বিএনপির কোনো সক্রিয়তা দেখা যায়নি।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি প্রচার শুরুর দিন দেশের সাতটি জেলায় জনসভায় বক্তব্য দিলেও কোথাও গণভোটের প্রসঙ্গ তোলেননি। গতকাল মঙ্গলবারসহ ছয় দিনে আরো অন্তত ১০টি নির্বাচনি জনসভায় অংশ নিলেও কোথাও গণভোট প্রসঙ্গে নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সারা দেশে বিএনপির প্রার্থীদেরও নির্বাচনি প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়নি।

তবে কয়েক জেলার বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, তারা দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। সম্প্রতি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার নির্বাচনি এলাকার একটি জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তার দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বলে জানান। তবে সেখানে তিনি ‘হ্যা’তে ভোট দেওয়া না দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

জানা গেছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘নাঁ’-এর বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের তৃণমূলে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাদেরও প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালাতে দেখা যায়নি। বিপরীতে কোনো কোনো জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে বিএনপি সমর্থিতদের চুপিসারে ‘না’ ভোটের প্রচার চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এটি দলের সিদ্ধান্ত কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও গণভোটের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ায় বিএনপির তৃণমূলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

গত ১৩ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, সংস্কারের বিপক্ষে আমরা নই। গণভোটে ‘হ্যাঁ’তে সমর্থন দেওয়াই আমাদের সিদ্ধান্ত। একই ভাবে দলের মুখপাত্র মাহদী আমিন আমার দেশকে বলেন, বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রয়েছে, প্রচারও চলছে।

এর আগে গণভোটে ‘না’ দেওয়ার সুযোগ নেই মন্তব্য করে গত ৯ জানুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার নির্বাচনি এলাকার এক অনুষ্ঠানে বলেন, একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আমরা চেয়েছিলাম, সেভাবেই হয়েছে। সংস্কারের বিষয়ে যে গণভোট হচ্ছে, সেগুলো আমরা বহু আগেই জাতির সামনে তুলে ধরেছিলাম। সেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।

বিএনপির ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, তারা গণভোটের পক্ষে হলেও এর বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের অসন্তোষ রয়েছে। দলটির দাবি, তারা যে জুলাই সনদে সই করেছিল, গণভোটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বিশেষ করে তারা যেসব নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল, তা গণভোটে আমলে নেওয়া হয়নি। গণভোটের প্রশ্নগুলো নিয়েও দলটির এক ধরনের আপত্তি রয়েছে, যে কারণে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইঙ্গিতে মুখে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বললেও প্রচারের ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

হতিরঝিল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আকরাম হোসেন টুটুল আমার দেশকে জানান, গণভোটের বিষয়ে তারা এখনো কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন আমার দেশকে বলেন, জেলা ও কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত গণভোটের ‘হ্যা’ বা ‘না’ কোনোটির পক্ষেই প্রচারের নির্দেশনা তারা পাননি। তারা শুধু ধানের শীষ প্রতীকের জন্য সাধারণ জনগণের কাছে ভোট চাচ্ছেন। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পেলে গণভোটের বিষয়ে ভোটারদের অবহিত করবেন। তবে জেলার হোমনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন দাবি করেন, তাদের দলের মহাসচিব ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে বলে দিয়েছেন। এজন্য তারা ধানের শীষের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, আমরা সংস্কারের পক্ষে। আমরা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছি। স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ পরে পরিবর্তন করে এতে অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সংস্কার কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া দলের এই প্রভাবশালী নেতা।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনি মাঠে বেশ সরব জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনি প্রচার, গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশে দলীয় প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী করার আহ্বান জানাচ্ছের দলগুলো নেতারা। দলীয় নেতা ও প্রার্থীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। দলীয়ভাবে প্রচারের পাশাপাশি ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমেও চলছে প্রচার কার্যক্রম।

সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য না হওয়ায় এ বিষয়ে আগে থেকেই গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছিল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ সমমনা দলগুলো। সে অনুযায়ী ভোটের সঙ্গে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ব্যাপক প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট দলগুলো। তারই অংশ হিসেবে এখন দেশজুড়ে প্রচার কার্যক্রম চলছে।

গত ১৫ জানুয়ারি ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য ঘোষণার দিন জোটের ঘোষণাপত্রে তিন দফা উদ্দেশ্যের মধ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনমত গঠনের কথাও বলা হয়। সে অনুযায়ী এর পক্ষে প্রচারসহ ‘হ্যাঁ’কে জয়যুক্ত করতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে জোটটি। জোটভুক্ত কোনো কোনো দল তাদের দলীয় প্রতীকে ভোট না দিলেও যেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়া হয়Ñএমন আহ্বান জানাচ্ছে ভোটারদের প্রতি।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, জুলাই বিপ্লবের গণআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’-এর বিজয়ের জন্য প্রচার চালাচ্ছে ফ্যাসিবাদবিরোধী ১১ দল নিয়ে গঠিত নির্বাচনি ঐক্য ।

সূত্রমতে, গত ২২ জানুয়ারি থেকে সংসদ নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলো। সেদিন থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে। প্রতিটি দলের সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে বিজয়ী করার আহ্বান জানাচ্ছেন প্রার্থীরা। এছাড়া ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমগুলোয়ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বিভিন্ন ধরনের প্রচার ও ফটোকার্ড পোস্ট করা হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় দলীয় প্রতীকের ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। প্রথম নির্বাচনি জনসভায়ই ‘হ্যাঁ’ ভোটের ওপর গুরুত্বারোপ করে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দেবেন। ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, ‘না’ মানে গোলামি। শহীদদের রক্তের প্রতি সম্মান দেখানোর নামই ‘হ্যাঁ’। গতকাল যশোরে নির্বাচনি জনসভায়ও তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বাংলাদেশ জিতে যাবে, ‘না’ জিতলে বাংলাদেশ হেরে যাবে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা মামুনুল হক তার নির্বাচনি জনসভায় বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বলতে চাইÑশহীদদের প্রতি যদি ন্যূনতম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকে, তবে মন থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকুন। উপরে উপরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলবেন আর ভেতরে ভেতরে ‘না’ ভোটের প্রচার করবেনÑএ ধরনের মুনাফিকির রাজনীতি আর চলবে না।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ত্রিমাত্রিক প্রচারে নেমেছে। তারা জনসচেতনতা তৈরিতে সামাজিকমাধ্যমে ভিডিও ও ফটোকার্ড প্রকাশ, লিফলেটসহ নানা ধরনের প্রচারপত্র বিতরণ এবং বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার করছে। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে শক্ত বার্তা দিয়ে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানানো হচ্ছে। গণভোটকে সামনে রেখে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার চালাতে এনসিপি ২৭০ আসনে প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে। তাদের নেতৃত্বে লিফলেট বিতরণ, পথসভা, উঠান বৈঠক ও কমিউনিটি সভার আয়োজন করা হচ্ছে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের পাশাপাশি কার্যক্রম গতিশীল করতে কার্যপরিধিভিত্তিক গণভোট উপকমিটি গঠন করেছে। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হককে প্রধান এবং দলটির আরেক যুগ্ম সদস্য সচিব আরমান হোসাইনকে সেক্রেটারি করে ২২ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলটি যে ২৭০টি আসনে প্রার্থী দেয়নি, সেখানে ‘গণভোটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বসেডর’ ঘোষণা করেছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম থেকে সোমবার নির্বাচনি পদযাত্রা শুরু করেছে এনসিপি। এ পদযাত্রায় দলটির প্রতীক শাপলা কলিতে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। পদযাত্রার গাড়িতেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের স্লোগান লেখা হয়েছে। দলটির ফেসবুক পেজের পোস্টে বলা হয়েছে, ‘নতুন চোখে বাংলাদেশ দেখতে গণভোটে হ্যাঁ বলি, মার্কা এবার শাপলা কলি’।

এদিকে নির্বাচনি পদযাত্রার আগে ভিডিও বার্তায় এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আমরা সংস্কার, সার্বভৌমত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার জন্য নির্বাচনি পদযাত্রা শুরু করেছি। চট্টগ্রাম থেকে সারা দেশ ঘুরে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থীদের পাশাপাশি গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে সচেতনতার কাজ করব। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সুন্দর একটি রূপান্তর ঘটবে বলে আশা করি।

১১ দলীয় জোট ছাড়াও ওই জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আরো কিছু দলও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরব। তবে সরাসরি ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিগত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অপর এক সঙ্গী ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশও ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল দাবি করে গণভোটে ‘না’ চিহ্ন দেওয়ার কথা বলেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের একটি অংশের প্রচারে গণভোটের বিষয় উপেক্ষিত হচ্ছে। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটা কাম্য নয়। যেসব দলকে আমরা গণভোটের বিষয়ে সিরিয়াস দেখেছিলাম তাদের মধ্যেও গণভোটের প্রচার দেখা যাচ্ছে না। তারা গণভোটের চেয়ে দলীয় প্রতীকের পক্ষেই ভোটকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, প্রচার কার্যক্রম চলাকালে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে গণভোট তথা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা। পাশাপাশি জনগণকে গণভোট প্রদানের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করা। রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের বিষয়ে নীরব থাকলে তরুণ ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেবে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন খুলনা অফিসের এহতেশামুল হক শাওন ও কুমিল্লা প্রতিনিধি এম হাসান]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন