ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্তে বলা হয়, বর্তমান সচিবালয়ের জায়গা ও ভবনসংকট, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং পর্যাপ্ত কর্মপরিবেশের অভাব বিবেচনায় শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে শেরেবাংলা নগরের প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নকশায় তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। এসব ভবনে মোট প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস থাকবে।
পরিকল্পনায় গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৩ হাজার ৮০০টি স্থান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি হবে ভূ-উপরিস্থ পার্কিং। এ ছাড়া মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি মাল্টিপারপাস হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া ও একটি ডাকঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য সংরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গায় ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত। পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবন ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। এসব ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ভূমিকম্পপ্রবণ ঢাকা শহরে এসব ভবনে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যমান ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত অফিস স্পেস ও ওয়াশ-ব্লক না থাকায় স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে সচিবালয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত চাহিদা এবং সচিবালয় কমপাউন্ডের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর স্থানসংকুলানের জন্য আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন।
এ প্রেক্ষাপটে নতুন সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নতুন নাম ‘নারী ও শিশু বিষয়ক’
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত এ প্রস্তাব অনুমোদনের ফলে মন্ত্রণালয়টির নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশ
বিদ্যুৎ খাতে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, ভর্তুকির চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তবে অধ্যাদেশটি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিংয়ের পর চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
সরকারের ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এর আওতায় আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ইতোমধ্যে প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে।
সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কোম্পানির ভবনের ছাদে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে অপারেশনাল এক্সপেনডিচার (ওপেক্স) মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় রয়েছে, তারা ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনায় ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (ক্যাপেক্স) মডেলেও এ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ওপেক্স মডেলে সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি—১৫ বছর পর্যন্ত—বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণ, ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে বিদ্যুতের অংশ প্রদান এবং রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬, ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ এবং বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-তে প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট বিধান নেই।
এসব সীমাবদ্ধতা দূর করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যেই বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
রটারডাম কনভেনশনে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ
বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনা জোরদারে ‘রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রায়র ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্থাপিত এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ রাসায়নিকের আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।
১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গৃহীত কনভেনশনটি ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়। ইতোমধ্যে ১৬৭টি দেশ এতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) অন্য সদস্যদেশগুলো কনভেনশনটি অনুমোদন বা এতে যোগ দিয়েছে।
কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত হলে বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানো, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন পেতে সহায়তা, রাসায়নিকের ডেটাবেজ তৈরি এবং রাসায়নিকের গতিবিধি অনুসরণ বা ট্র্যাকিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি কনভেনশনের সংযুক্তি-৩-এ তালিকাভুক্ত রাসায়নিকের বিষয়ে পূর্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানি ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে যৌথ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়া যাবে।
কনভেনশনের তথ্য বিনিময়বিষয়ক ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আইনি তথ্য সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে বিনিময় করতে পারবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সদস্যদেশ ও কনভেনশন সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহযোগিতা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


